ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর ছয় মাস হতে চলল। এই ছয় মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতির কিছু সূচকে উন্নতি দেখা গেলেও সামগ্রিক স্বস্তির কারণ খুব বেশি নেই।

মূল্যস্ফীতি এ মুহূর্তে সবচেয়ে দৃশ্যমান সমস্যা। জুলাইয়ে হার কিছুটা কমলেও তা এখনো ৮ শতাংশের ওপরে। এটিকে স্বাভাবিক পরিস্থিতি বলা যায় না। দীর্ঘ সময়ের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে, সঞ্চয়ের মূল্য ক্ষয় হয়েছে এবং খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের ব্যয় বেড়েছে।

মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ দাম কমা নয়; দাম আগের তুলনায় ধীরগতিতে বাড়ছে মাত্র। ফলে নীতিনির্ধারকদের আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। কঠোর মুদ্রানীতি প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু শুধু উচ্চ সুদের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমাতে গেলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে চাপ বাড়বে। বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির বড় অংশ খাদ্য সরবরাহ, আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার, জ্বালানি খরচ ও বাজার ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও যুক্ত।

বহিঃখাতে প্রবাসী আয় কিছুটা সুরক্ষা দিচ্ছে। কিন্তু রপ্তানির দুর্বলতা এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির মধ্যে রেমিট্যান্সের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নতুন ঝুঁকি তৈরি করে। শক্তিশালী রেমিট্যান্স স্বস্তি দেয়, কিন্তু উৎপাদনশীলতা, রপ্তানিবৈচিত্র্য এবং বিনিয়োগের দুর্বলতার বিকল্প নয়। দীর্ঘ মেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতি টেকসই করতে হলে পণ্য ও সেবা রপ্তানির ভিত্তি বিস্তৃত করতে হবে।

.
সবশেষে কর্মসংস্থানকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে হবে। স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং ও আইসিটির সম্ভাবনা আছে, কিন্তু বড় শ্রমশক্তির জন্য এগুলো যথেষ্ট নয়। শ্রমঘন উৎপাদন, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, লজিস্টিকস, ছোট ও মাঝারি শিল্প এবং বাস্তব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত দক্ষতা উন্নয়ন প্রয়োজন। অর্থনীতির সাফল্য শুধু প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে নয়, মানুষের প্রকৃত আয় ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান দিয়ে বিচার করা উচিত।
.

বেসরকারি বিনিয়োগের দুর্বলতা আরও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্মেলন, অর্থনৈতিক অঞ্চল, কর প্রণোদনা বা নতুন প্রতিষ্ঠান কম নেই। কিন্তু উদ্যোক্তারা সিদ্ধান্ত নেন বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ কতটা নির্ভরযোগ্য, ঋণের খরচ কত, বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়া যায় কি না, কর ও শুল্কের নিয়ম কতটা পূর্বানুমানযোগ্য, অনুমোদনে কত সময় লাগে—এসবই বিনিয়োগ নির্ধারণ করে। দেশীয় উদ্যোক্তারাই যখন নতুন বিনিয়োগে সতর্ক, তখন শুধু বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রচার যথেষ্ট হবে না। বিনিয়োগের সমস্যা আসলে আস্থার সমস্যা, আর সেই আস্থা তৈরি হয় নীতির ধারাবাহিকতা ও প্রতিষ্ঠানের আচরণ থেকে।

জ্বালানিসংকট এই দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়েছে। এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন, গ্যাসের ঘাটতি এবং সার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকার ঘটনা দেখিয়েছে যে বাংলাদেশের জ্বালানিব্যবস্থায় স্থিতিস্থাপকতা সীমিত। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বা সরবরাহে একটি ধাক্কা দ্রুত অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, মূল্যস্ফীতি এবং বিনিয়োগে প্রভাব ফেলে। সরকার জরুরি আমদানি, ঋণ ও ভর্তুকির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামলাতে পারে, কিন্তু এগুলো সময় কেনে মাত্র। মূল সমস্যা রয়ে যায়। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, আমদানির উৎসবৈচিত্র্য, শক্তিদক্ষতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং গ্রিড উন্নয়নে দ্রুত অগ্রগতি না হলে একই সংকট বারবার ফিরে আসবে।

.ভুতুড়ে বিল, লোডশেডিং, সিস্টেমে চুরি ও ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত.

জ্বালানির মূল্য নির্ধারণেও একটি সুস্পষ্ট নীতি প্রয়োজন। দীর্ঘদিন কৃত্রিমভাবে কম মূল্য রাখা আর্থিকভাবে টেকসই নয়। আবার সরবরাহের মান না বাড়িয়ে বারবার দাম বাড়ানোও গ্রহণযোগ্য নয়। মূল্য সমন্বয় হলে তা ধাপে ধাপে, পূর্বঘোষিত এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য মধ্যমেয়াদি জ্বালানিকৌশলের অংশ হওয়া উচিত। শিল্প এমনকি তুলনামূলক বেশি মূল্যও সামলাতে পারে, যদি সরবরাহ নির্ভরযোগ্য হয়। অনিশ্চিত মূল্য ও অনিশ্চিত সরবরাহ একসঙ্গে থাকলে বিনিয়োগের হিসাবটাই দুর্বল হয়ে পড়ে।

রাজস্ব নীতিতে বাস্তবতার ঘাটতি স্পষ্ট। প্রায় প্রতিবছর উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, পরে তা অর্জিত হয় না। নতুন বাজেটেও বড় বৃদ্ধির প্রত্যাশা রয়েছে। কিন্তু কর প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন, করের আওতা বাড়ানো এবং করছাড় কমানোর মতো সংস্কার সময়সাপেক্ষ। অবাস্তব লক্ষ্য দিয়ে ব্যয়ের কাঠামো দাঁড় করালে শেষ পর্যন্ত ঋণ বাড়ে অথবা উন্নয়ন ব্যয় কাটতে হয়। করভিত্তি অবশ্যই বাড়াতে হবে, তবে সহজে ধরা যায়, এমন ছোট ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্তের ওপর বাড়তি চাপ দিয়ে নয়। বড় কর ফাঁকি, অঘোষিত সম্পদ, উচ্চ আয়ের পেশাজীবী এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও একই কঠোরতা দরকার।

ব্যাংক খাতের ক্ষেত্রে আরও কঠোর অবস্থান প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের দুর্বল তদারকি, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের সুবিধা এবং পুনঃপুন ঋণ পুনঃ তফসিল বর্তমান সংকটকে গভীর করেছে। কিছু ব্যাংকে পুনর্গঠন বা পুনর্মূলধন প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু জনগণের অর্থ ব্যবহারের আগে সম্পদের প্রকৃত মান যাচাই, দায়ী পরিচালকদের জবাবদিহি, খেলাপি ঋণ উদ্ধারের পরিকল্পনা এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা প্রয়োজন। অন্যথায় সংস্কারের নামে পুরোনো ক্ষতির দায় করদাতার ওপর স্থানান্তর হবে।

.নীরব মহামারি মূল্যস্ফীতি যে মহাভুলে কমছেই না.

এ পরিস্থিতির মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগ এসেছে। এগুলোর সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু প্রত্যাশাও বাস্তবসম্মত রাখা দরকার। ফ্যামিলি কার্ড সামাজিক সুরক্ষাকে আরও সমন্বিত করতে পারে এবং নারীর হিসাবে সরাসরি অর্থ দেওয়া ইতিবাচক ফল দিতে পারে। কিন্তু বড় আকারে সম্প্রসারণের আগে পাইলটের ফলাফল মূল্যায়ন জরুরি। কারা প্রকৃত দরিদ্র, কারা বাদ পড়ছেন, পুরোনো ভাতাগুলো কীভাবে সমন্বিত হবে, একজন একই সঙ্গে একাধিক সুবিধা পাচ্ছেন কি না এবং অভিযোগের নিষ্পত্তি কীভাবে হবে, এসবের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা ছাড়া দ্রুত সম্প্রসারণ করলে অপচয় ও রাজনৈতিক প্রভাব—দুটিই বাড়তে পারে।

কৃষক কার্ডের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সার, বীজ, ঋণ, বিমা, যন্ত্রপাতি, আবহাওয়ার তথ্য ও বাজারদর একটি পরিচয়ের মাধ্যমে পাওয়া গেলে কৃষকের লেনদেন খরচ কমতে পারে। কিন্তু কার্ডকে যেন সমস্যার সমাধান হিসেবে অতিরঞ্জিত না করা হয়। সার যথাসময়ে না এলে, কৃষিঋণ প্রকৃত চাষির কাছে না পৌঁছালে বা বাজারে কৃষক ন্যায্যমূল্য না পেলে একটি ডিজিটাল পরিচয় খুব বেশি পরিবর্তন আনবে না। আবার জমির মালিকানার তথ্যের ওপর বেশি নির্ভর করলে বর্গাচাষি ও ভূমিহীন প্রকৃত কৃষক বাদ পড়ার ঝুঁকি আছে। প্রযুক্তির চেয়ে সেবার গুণমান তাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সামনের ঝুঁকিগুলোও কম নয়। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘ হলে জ্বালানি আমদানির ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। রপ্তানি দুর্বল থাকলে বৈদেশিক মুদ্রায় চাপ তৈরি হবে। ব্যাংক পুনর্গঠনের ব্যয় বাজেটে আসতে পারে। কঠোর মুদ্রানীতি বিনিয়োগকে আরও কিছু সময় দুর্বল রাখতে পারে। এর সঙ্গে এলডিসি থেকে উত্তরণ, বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা এবং জলবায়ুজনিত খাদ্য ও কৃষিঝুঁকি যুক্ত হবে।

.

স্বল্প মেয়াদে সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত মূল্যস্ফীতিকে আরও নিচে আনা, তবে উৎপাদনকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে সংকুচিত না করা। খাদ্য, জ্বালানি ও সারের মজুত এবং সরবরাহের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার। নির্বিচার মূল্য ভর্তুকির পরিবর্তে যাচাই করা দরিদ্র ও নিম্নমধ্য আয়ের পরিবারকে লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তা বেশি কার্যকর হতে পারে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে হাসপাতাল, সেচ, সার, খাদ্য সংরক্ষণ এবং রপ্তানিশিল্পের অগ্রাধিকার স্পষ্ট করতে হবে।

মধ্য মেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজির উৎসবৈচিত্র্য, শিল্পে শক্তিদক্ষতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং গ্রিড আধুনিকায়ন একসঙ্গে এগোতে হবে। করছাড়ের পূর্ণ হিসাব প্রকাশ করে অকার্যকর সুবিধা প্রত্যাহার করা প্রয়োজন। ব্যাংক সংস্কারকে বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। আর ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও অন্যান্য সামাজিক কর্মসূচিকে একটি নির্ভরযোগ্য সামাজিক নিবন্ধনের সঙ্গে যুক্ত করা উচিত।

.

সবশেষে কর্মসংস্থানকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে হবে। স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং ও আইসিটির সম্ভাবনা আছে, কিন্তু বড় শ্রমশক্তির জন্য এগুলো যথেষ্ট নয়। শ্রমঘন উৎপাদন, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, লজিস্টিকস, ছোট ও মাঝারি শিল্প এবং বাস্তব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত দক্ষতা উন্নয়ন প্রয়োজন। অর্থনীতির সাফল্য শুধু প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে নয়, মানুষের প্রকৃত আয় ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান দিয়ে বিচার করা উচিত।

সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ, বিনিয়োগ দুর্বল এবং জ্বালানি ও ব্যাংক খাতের ঝুঁকি বড়। সরকার নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে, কিন্তু সরকারি কর্মসূচির সংখ্যা নয়, বাস্তব ফলাফলই শেষ পর্যন্ত বিবেচ্য। বাংলাদেশের সমস্যার তালিকা দীর্ঘ। সে কারণেই সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকা ছোট ও স্পষ্ট হওয়া দরকার: মূল্যস্ফীতিকে টেকসইভাবে নিয়ন্ত্রণ, বাস্তবসম্মত রাজস্ব নীতি, ব্যাংক খাতে জবাবদিহি, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা এবং কর্মসংস্থান।

  • সেলিম রায়হান অর্থনীতির অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, সানেম

  • [email protected]

  • মতামত লেখকের নিজস্ব