কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ও ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার স্টাব মনে করেন, বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় মধ্যম শক্তির দেশগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। দ্য ইকোনমিস্ট-এ প্রকাশিত এক যৌথ লেখায় তাঁরা বলেছেন, ‘আমরা যে পৃথিবী চাই, সেটি আসার অপেক্ষায় না থেকে পৃথিবী এখন যেমন, সেই বাস্তবতাকে সক্রিয়ভাবে মোকাবিলা করতে হবে।’
তাঁদের বক্তব্যে কার্নির জানুয়ারিতে দাভোসে দেওয়া বক্তৃতা এবং স্টাবের গত ডিসেম্বরে ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’-এ প্রকাশিত নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ার আহ্বানেরই প্রতিফলন দেখা যায়। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ‘বিচ্ছেদ’ ঘটেছে—কার্নির এই ঘোষণা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের প্রকাশ্য সমালোচনা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল।
কার্নি ও স্টাবের মতে, কানাডা ও ফিনল্যান্ডের মতো দেশগুলো পুরোনো ভূরাজনৈতিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করে থাকতে পারবে না। কানাডার সীমান্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে, আর ফিনল্যান্ডের সীমান্ত রাশিয়ার সঙ্গে। সে কারণে তাঁরা ভারত, চীন ও বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর কথা বলছেন। তবে লক্ষ্য থাকে—কোনো একটি দেশের ওপর কৌশলগত নির্ভরতা এড়িয়ে চলা।
তাঁদের প্রস্তাব হলো, মধ্যম শক্তির দেশগুলো গত ৮০ বছরের বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা এবং সাম্প্রতিক বহুমেরু বিশ্বের মাঝামাঝি একটি পথ তৈরি করবে। এই ব্যবস্থাকে তাঁরা বলছেন ‘প্লুরিল্যাটারালিজম’। এর ব্যাখ্যায় তাঁরা বলেন, কোনো একটি বিষয়ে অভিন্ন স্বার্থ থাকা দেশগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী অস্থায়ী জোট তৈরি করবে। সমস্যা বদলালে জোটের সদস্যও বদলাতে পারে।
২০০২ সালে ইরাকে হামলার জন্য তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ জাতিসংঘের বিরোধিতা পাশ কাটিয়ে ‘ইচ্ছুকদের জোট’ গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। কানাডা ও ফিনল্যান্ড তখন এর বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন।
কার্নি ও স্টাবের ধারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তাঁরা নতুন শীতল যুদ্ধের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁদের মতে, বিশ্বকে রাশিয়া-চীন বনাম পশ্চিম—এভাবে দেখার বিষয়টি সঠিক হবে না। বরং বৈশ্বিক পশ্চিম, বৈশ্বিক পূর্ব ও বৈশ্বিক দক্ষিণ—এই তিনটি বৃহৎ অংশের মধ্যে সম্পর্কের নতুন কাঠামো গড়ে উঠতে পারে। একাধিক দেশের উদ্যোগে নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও পরিবেশের মতো বিষয়ে নতুন সহযোগিতা দাঁড়াতে পারে।
তবে এখানে একটি বড় চ্যালেঞ্জও আছে। বহুপক্ষীয় সহযোগিতা আর বিশৃঙ্খলার মধ্যে পার্থক্য সবসময় স্পষ্ট নাও হতে পারে। একমেরু, দ্বিমেরু বা বহুমেরু শক্তির কাঠামোয় বিশ্বকে দেখার ধারণা মূলত বিশ শতকের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্ব থেকে এসেছে। তখন পৃথিবীতে রাষ্ট্র ছিল প্রায় ৫০টি। এখন প্রায় ২০০টি। ভূখণ্ড, জনসংখ্যা, সামরিক শক্তি ও শিল্পসক্ষমতা তখন ক্ষমতার প্রধান ভিত ছিল। বর্তমান বিশ্ব অনেক বেশি জটিল এবং পরস্পরনির্ভরশীল।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের ‘বহুমুখী মৈত্রী’ নীতির বিষয়টি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ভারত একই সময়ে সব বড় শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখে এবং কোনো একটি শক্তির সঙ্গে একচেটিয়া সম্পর্ক গড়ে তোলে না। ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বহু দেশও একই পথে হাঁটছে।
জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ শতকের ধ্বংসাবশেষে পরিণত হওয়া ঠেকাতে মধ্যম শক্তির দেশগুলোর উচিত এসব প্রতিষ্ঠানের ভেতরে বা কাছাকাছি থেকে ‘ইচ্ছুকদের জোট’ তৈরি করা। তারা নির্দিষ্ট নীতিগত লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি ভোটব্যবস্থায় পরিবর্তন, অরাষ্ট্রীয় পক্ষের সীমিত ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক আইন কার্যকর করার শক্তিশালী ব্যবস্থা তৈরির মতো সংস্কারও করতে পারে।
আরেকটি বড় পর্যবেক্ষণ হলো, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এখন শুধু কেন্দ্রীয় সরকারের বিষয় নয়। সরকার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শহর, নাগরিক সংগঠন এবং অন্যান্য অরাষ্ট্রীয় পক্ষও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় ভূমিকা রাখছে। ডন ট্যাপস্কট ও টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্টিন প্রস্পেরিটি ইনস্টিটিউট ৫০০টির বেশি বৈশ্বিক সমাধান নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করেছে। এসব নেটওয়ার্ক সমৃদ্ধি, জলবায়ু স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্য ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মতো বিষয়ে কাজ করছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম বহু বছর ধরেই এ ধরনের সহযোগিতামূলক গোষ্ঠী গড়ে তুলছে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা কার্যক্রম প্ল্যাটফর্মেও হাজার হাজার উদ্যোগ রয়েছে। ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিজ বিশ্বের বিভিন্ন শহরের মেয়রদের পরস্পরের সঙ্গে এবং অন্যান্য স্থানীয় ও আঞ্চলিক কর্মকর্তার সঙ্গে কাজ করতে সহায়তা করছে।
এসব উদ্যোগ মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের ‘ঘন–সন্নিবিষ্ট সংযোগের জাল’। লেখক একে ‘আর্মাডিলো ব্যবস্থা’ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে এই জাল যদি খুব ঘন হয়ে যায়, তাহলে তা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ফলে প্রশ্ন ওঠে—মধ্যম শক্তির দেশগুলোর এই নতুন সহযোগিতা কীভাবে একটি সত্যিকার অর্থে কার্যকর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা হয়ে উঠবে।
কার্নি ও স্টাবের মূল্যবোধভিত্তিক বাস্তববাদের ভিত্তি হলো স্বাধীনতা, মানবাধিকার, টেকসই উন্নয়ন ও সংহতি। কিন্তু এসব মূল্যবোধকে কার্যকরভাবে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর পথ হিসেবে তাঁরা বিদ্যমান বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করার কথাই বলেন। শুরুটা হওয়া উচিত জাতিসংঘ দিয়ে।
জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ শতকের ধ্বংসাবশেষে পরিণত হওয়া ঠেকাতে মধ্যম শক্তির দেশগুলোর উচিত এসব প্রতিষ্ঠানের ভেতরে বা কাছাকাছি থেকে ‘ইচ্ছুকদের জোট’ তৈরি করা। তারা নির্দিষ্ট নীতিগত লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি ভোটব্যবস্থায় পরিবর্তন, অরাষ্ট্রীয় পক্ষের সীমিত ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক আইন কার্যকর করার শক্তিশালী ব্যবস্থা তৈরির মতো সংস্কারও করতে পারে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার উদাহরণটি এই যুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ। সংস্থাটির নিয়ম এখনো বিশ্বের প্রায় ৭২ শতাংশ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু ঐকমত্যভিত্তিক নিয়মের কারণে ই-কমার্সের মতো বিষয়ে নতুন নিয়ম তৈরি দীর্ঘদিন আটকে ছিল। ২০১৯ সালে অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও সিঙ্গাপুর ৮৬টি সদস্যদেশকে নিয়ে ‘জয়েন্ট স্টেটমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা সত্ত্বেও ৬৬টি সদস্যদেশ পরবর্তী চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এটি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সঙ্গে যুক্ত, তবে প্রচলিত কাঠামোর বাইরে তৈরি একটি বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা।
এই নজির থেকে বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক আইনের সৃজনশীল প্রয়োগের মাধ্যমে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। জাতিসংঘ ও অন্যান্য বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানেও একই ধরনের পথ খুঁজে বের করা যেতে পারে।
অস্থায়ীভাবে কাজ করা তুলনামূলকভাবে সহজ। কিন্তু বিশ্বের অধিকাংশ ভূখণ্ড ও জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্বকারী মধ্যম শক্তির দেশগুলো যদি দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যকর বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে না পারে, তাহলে আর কার পক্ষেই তা সম্ভব হবে?
অ্যান-মেরি স্লটার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের নীতি পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক পরিচালক
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনূদিত