ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুই দিনব্যাপী বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কার্যদলের (জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ) বৈঠক শুরু হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, স্থলবন্দরের বিদ্যমান বাধা দূর করা, বাংলাদেশি পাটপণ্যের ওপর ভারতের আরোপিত শুল্ক পুনর্বিবেচনা এবং আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক করাই এই বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (এফটিএ) আয়েশা আক্তারের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি বাংলাদেশি প্রতিনিধিদল গতকালই নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নিতে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে আরও জানা গেছে, দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য-ঘাটতি কমিয়ে আনা, পণ্য আমদানি ও রপ্তানির ক্ষেত্রে সৃষ্ট বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশি পাটপণ্যে ভারতের নতুন শুল্ক আরোপ এবং ভারতীয় সুতা আমদানিতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নেওয়া বিধিনিষেধের বিষয়টি আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কার্যদলের সর্বশেষ বৈঠকটি ২০২৩ সালের ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তার আগে ২০২২ সালের ২ ও ৩ মার্চ নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয় ১৪তম বৈঠক।
২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে কিছুটা টানাপোড়েন তৈরি হয়, যার প্রভাব পড়ে বাণিজ্য আলোচনায়। এই পরিস্থিতির কারণে নিয়মিত এই বৈঠকটি নির্ধারিত সময়ে আয়োজন করা সম্ভব হয়নি।
এর আগের বৈঠকগুলোতে স্থলবন্দর ও সমন্বিত সীমান্তচৌকির অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বন্দরসংক্রান্ত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, সীমান্ত হাট চালু করা, রেলপথে পণ্য পরিবহন বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। এছাড়া পণ্যের মানদণ্ড নির্ধারণে পারস্পরিক স্বীকৃতি ও সমন্বয়, বাংলাদেশ-ভারত সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি নিয়ে যৌথ সমীক্ষা এবং পেট্রাপোল-বেনাপোল চেকপোস্ট ২৪ ঘণ্টা চালু রাখার বিষয়টিও আলোচনার তালিকায় ছিল।
দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের একটি বড় বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে স্থলবন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রে। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ বেনাপোল, ভোমরা, সোনামসজিদ, বাংলাবান্ধা ও বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় সুতা আমদানির সুবিধা বন্ধ করে দেয়, যদিও সমুদ্রপথে আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছিল।
এর কয়েক সপ্তাহ পরেই ভারত বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক ও পিভিসিসহ বিভিন্ন পণ্য স্থলপথে আমদানির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে। ওই বছরের জুনে পাট ও নির্দিষ্ট কিছু বস্ত্রপণ্যের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ দেওয়া হয়।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বেনাপোল স্থলবন্দরের রপ্তানি পরিসংখ্যানে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এই বন্দর দিয়ে ভারতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি হয়েছে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৩৫৮ টন, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩ লাখ ৮১ হাজার ৪৪০ টন। তবে রপ্তানির পরিমাণ কমলেও আয় প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বেনাপোল দিয়ে রপ্তানি আয় হয়েছে ১৭৫ কোটি ডলার, যেখানে আগের অর্থবছরে তা ছিল ১৭৬ কোটি ডলার।
বৈঠকের ঠিক আগে বাংলাদেশি পাটপণ্যে ভারতের নতুন শুল্ক আরোপের বিষয়টি সামনে এসেছে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি করা পাটের সুতা ও টুইন, হেসিয়ান কাপড়, পাটের বস্তা ও স্যাকিং ক্লথের ওপর সংশোধিত অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক নির্ধারণ করে।
বাংলাদেশি পাটের সুতা ও টুইনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি টনে ৪৪৫ ডলার। ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন তদন্তের ভিত্তিতে এই শুল্ক আরোপ করা হয়নি, বরং আগের শুল্কের মধ্যবর্তী পর্যালোচনার ভিত্তিতে হার পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
পাশাপাশি গত ২৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশসহ পাঁচটি দেশ থেকে আমদানি করা পিইটি ফিল্মের ওপর প্রতি টনে সর্বোচ্চ ২১৮ ডলার অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপের সুপারিশ করেছে ভারতের বাণিজ্য প্রতিকার অধিদপ্তর (ডিজিটিআর)। বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান আকিজ বায়াক্স ফিল্মসের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত শুল্ক ধরা হয়েছে ৫৮ ডলার। তবে ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন না আসা পর্যন্ত এই সুপারিশ কার্যকর হবে না।
নয়াদিল্লির এই বৈঠকের এজেন্ডা তৈরির আগে গত মে মাসে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তখন ব্যবসায়ীরা স্থলবন্দরের বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, অশুল্ক বাধা দূর করা এবং আগে বাতিল হওয়া ট্রান্সশিপমেন্ট-সুবিধা পুনরায় চালুর সুপারিশ জানান।
গত মাসে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনার পবনকুমার তুলসীদাস এফবিসিসিআই নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমানোর পাশাপাশি দুই দেশের ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে একটি যৌথ ব্যবসায়ী টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
এর আগে গত আগস্ট মাসে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির ও ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠকে সীমান্ত হাট চালু, স্থলবন্দরগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ভারতীয় সুতা আমদানিতে বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল।