হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সম্প্রতি দেখা গেছে এ দেশের অত্যন্ত দুর্লভ আবাসিক পাখি মৌবাজ। মধুবাজ বা মৌচিল নামেও পরিচিত এই শিকারি পাখিটি প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়।
পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ আ ন ম আমিনুর রহমান জানান, তিনি প্রথম এই মধু ও মৌমাছিভুক পাখিটিকে দেখেছিলেন রাজশাহী থেকে ট্রেনযোগে কুষ্টিয়া যাওয়ার পথে, ঠিক যখন ট্রেনটি পাকশীর হার্ডিঞ্জ সেতুতে ওঠার আগমুহূর্তে ছিল। তবে ট্রেনের দ্রুতগতির কারণে সঙ্গে ক্যামেরা থাকা সত্ত্বেও তখন ছবি তোলা সম্ভব হয়নি। ঠিক এক মাস পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ উদ্যানে তিনি পাখিটির ছবি তুলতে সক্ষম হন। এরপর বিভিন্ন সময়ে ঢাকার জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান, কক্সবাজারের সোনাদিয়ায় যাওয়ার পথে কুতুবজোম এলাকা এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে এই পাখির দেখা পেয়েছেন তিনি। সর্বশেষ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ থানার কুরমা পক্ষী অভয়াশ্রমে পাখিটিকে দেখা যায়।
পরের বছর বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের অর্থায়নে একটি প্রকল্পের আওতায় তিনি কাজ করার সুযোগ পান, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল উড়োজাহাজের সঙ্গে পাখির সংঘর্ষ রোধে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভেতর ও বাইরে অবস্থানরত পাখিদের একটি তালিকা তৈরি করা। এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে প্রায় দেড় বছর ধরে বিমানবন্দর এবং এর ১০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে অবস্থানকারী পাখিদের নিয়ে তিনি জরিপের কাজ পরিচালনা করেন।
২০২৪ সালের ৬ এপ্রিল সকালে বিমানবন্দরের ভেতরে পাখি জরিপ করার সময় তিনি বিমানবন্দর ও কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটির সীমানাপ্রাচীরের পাশে একটি বড় মেঘশিরীষগাছে দুটি মধুভুক পাখি বসে থাকতে দেখেন। সেখানে প্রায় ৩২টি ছবি তোলার পর পাখিগুলো উড়ে গিয়ে সীমানাপ্রাচীরের ল্যাম্পপোস্টে বসে। সেখানে তারা ৪ মিনিট ২০ সেকেন্ড অবস্থান করে এবং এই সময়ের মধ্যে আরও ৫২টি ছবি তোলা হয়।
পাখিগুলোর শারীরিক গঠন দেখে বোঝা গিয়েছিল যে সেগুলো ছিল অল্পবয়স্ক বা ছানা পাখি। এর প্রায় সাড়ে আট মাস পর রানওয়ের ওপর উড়তে দেখা যায় একই প্রজাতির আরেকটি পাখিকে, যা একটি ভুবন চিলের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছিল। ধারণা করা হয়, এটি সেই ছানাগুলোরই একটি হতে পারে। তবে সেই মুহূর্তে তিনি বুঝতে পারেননি যে এটি সাড়ে আট মাস আগে দেখা সেই প্রজাতির শিকারি পাখি। পরবর্তীতে বাসায় ফিরে কম্পিউটারে ছবি আপলোড করার পর তিনি পাখিটিকে চিনতে পারেন।
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দেখা এই শিকারি পাখিগুলো এ দেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি মৌবাজ। মধুবাজ বা মৌচিল নামেও পরিচিত এই পাখিটিকে পশ্চিমবঙ্গে বলা হয় মৌখাকি বাজ। ইংরেজিতে একে ওরিয়েন্টাল/ক্রেস্টেড/ইস্টার্ন হানি-বাজার্ড বলা হয়। অ্যাক্সিপিট্রিডি গোত্রের এই পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম pernis ptilorhynchus। বাংলাদেশ ছাড়াও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এই পাখির দেখা মেলে।
প্রথম দর্শনে একে বাজের মতো মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে মৌবাজ লম্বা ও সরু দেহের এক প্রজাতির চিল। তবে চিলের তুলনায় এর মাথা অপেক্ষাকৃত ছোট। লম্বায় এরা ৫৫-৬৮ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে। পুরুষ পাখির ওজন ৭৫০ থেকে ১ হাজার ২৮০ গ্রাম এবং স্ত্রী পাখির ওজন কিছুটা বেশি—৯৫০ থেকে ১ হাজার ৪৯০ গ্রাম। এদের দেহের রঙে বেশ বৈচিত্র্য দেখা যায়। প্রথমবার দেখলে মনে হতে পারে মাথায় কালচে ছোট ঝুঁটিযুক্ত কালচে-লালচে-বাদামির মিশেলে গড়া চিত্র-বিচিত্র এক পাখি। তবে সাধারণভাবে এটি ধূসর মাথাওয়ালা এক চিল, যার বুক ও পেট বাদামি। এর ওপর আড়াআড়িভাবে অসংখ্য সাদাটে-বাদামি রেখা থাকে। এদের গলা সাদাটে, চোখ কমলা-লাল, ঠোঁট মেটে-কালো এবং পা ও পায়ের পাতা হলুদ রঙের। স্ত্রী পাখির মুখমণ্ডল ও পিঠ তুলনামূলকভাবে বেশি বাদামি। পুরুষ পাখির লেজে দুটি এবং স্ত্রী পাখির লেজে তিনটি কালো ফিতের মতো দাগ থাকে।
মৌবাজ দেশের যেকোনো অঞ্চলে দেখা যেতে পারে। এরা সাধারণত বনের ফাঁকা জায়গা, আবাদি জমি বা ছায়াঘেরা বন-বাগানে বসবাস করে। মৌচাকের মধু, মৌমাছির ডিম ও বাচ্চা এদের অত্যন্ত প্রিয় খাদ্য। এ ছাড়া এরা সাপ, ব্যাঙ, ইঁদুর ও গিরগিটি খেয়ে থাকে। এপ্রিল থেকে জুন মাস এদের প্রজননকাল। এই সময়ে মাটি থেকে ৬-২৮ মিটার উচ্চতায় গাছের শাখায় সরু ডালপালা ও পাতা দিয়ে এরা বাসা তৈরি করে। বাসা তৈরি হলে স্ত্রী পাখি ১-৩টি ফিকে লালচে রঙের ডিম পাড়ে, যা ২৮-৩৫ দিনের মধ্যে ফোটে। স্ত্রী ও পুরুষ পাখি উভয়েই ছানাদের লালন-পালন ও খাওয়ানোর দায়িত্ব পালন করে। পাঁচ-ছয় সপ্তাহের মধ্যে ছানারা উড়তে শিখলেও মা-বাবার সাহায্য ছাড়া স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে আরও পাঁচ থেকে আট সপ্তাহের প্রয়োজন হয়। এদের গড় আয়ুষ্কাল ১১-১২ বছর।
তথ্য প্রদান করেছেন: আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।