সৌদি আরবের রিয়াদে হুতি বিদ্রোহীদের ভয়াবহ হামলার পর বিমানবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম সংকটে পড়েছেন বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবগামী অসংখ্য যাত্রী। রিয়াদ ও দাম্মাম বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে, যার ফলে কর্মস্থলে ফেরার তাগিদ থাকা প্রবাসীরা এখন চাকরি হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।
আজ সোমবার বেলা ২টায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে সৌদি আরবের দাম্মাম যাওয়ার কথা ছিল আবুল হোসেনের। এই ফ্লাইটটি ধরতে তিনি নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে সকাল ১০টার দিকেই ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। তবে বিমানবন্দরে এসে তিনি জানতে পারেন যে তাঁর কাঙ্ক্ষিত ফ্লাইটটি বাতিল করা হয়েছে।
আবুল হোসেন জানান, তিনি গত ছয় বছর ধরে সৌদি আরবে কর্মরত আছেন এবং বর্তমানে সেখানে টাইলস মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করছেন। তিন মাসের ছুটিতে দেশে আসা আবুল হোসেন তাঁর ছুটির মেয়াদ অনুযায়ী তিন মাস আগেই ফেরার টিকিট সংগ্রহ করেছিলেন। এখন ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় কর্মস্থলে সময়মতো ফিরতে পারবেন কি না, তা নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগে রয়েছেন। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘তিন মাসের ছুটি ছিল। ছুটি শেষ হয়েছে। এখন যাইতে না পারলে চাকরি বাঁচানো যাবে না। সবকিছু অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাবে।’
একই পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন মো. মোসলেম তালুকদার। বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে তাঁর রিয়াদগামী ফ্লাইট ছিল। ফ্লাইটটি ধরতে সকাল ১০টা থেকেই তিনি হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিলেন, কিন্তু সেখানে এসে ফ্লাইট বাতিলের খবর পান। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে মোসলেম তালুকদার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘দুপুর ১২টায় ফ্লাইট ছিল, যেতে পারিনি, বিমান বন্ধ, ফ্লাইট ক্যান্সেল (বাতিল) হয়েছে। এখন দেখছি, অন্য কোনো ফ্লাইটে যেতে পারি কি না। নইলে বাড়ি ফিরে যেতে হবে।’ তিনি জানান, রিয়াদের একটি দোকানে তাঁর কাজে যোগ দেওয়ার কথা ছিল।
আজ সোমবার দুপুর ১টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবস্থানরত ১৫ জনেরও বেশি যাত্রীর সঙ্গে কথা বলেছে মুক্তকণ্ঠ। দেখা গেছে, তাঁদের অধিকাংশ যাত্রীই ফ্লাইট বাতিলের বিষয়টি আগে জানতেন না। কেউ কেউ বিকল্প ফ্লাইটের আশায় অপেক্ষা করছিলেন, তবে তাঁদের কেউই বিমানবন্দরে আসার আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনস বা টিকিট বিক্রয় কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি।
উল্লেখ্য, গত শনিবার রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের এক ভয়াবহ হামলায় ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবে এটি সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর পর গতকাল রোববার ওই বিমানবন্দরে পুনরায় হামলা চালানো হয়, যাতে আরও ১ জন নিহত এবং ১১ জন আহত হন।
এই ধারাবাহিক হামলার পর রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এখনো বন্ধ রাখা হয়েছে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের বিমান চলাচলে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। এমনকি জেদ্দার কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া এবং সেখানে পৌঁছানো ফ্লাইটেও অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শনিবার রাত থেকে রিয়াদগামী উড়োজাহাজের ফ্লাইট বাতিল করা হলেও আজ সোমবার থেকে জেদ্দাগামী কিছু ফ্লাইটও বাতিল করা হয়েছে। বিমানবন্দরের তথ্য অনুযায়ী, বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে থাকা ফ্লাইনাস এয়ারলাইনসের জেদ্দাগামী ফ্লাইটটি বাতিলের তালিকায় রয়েছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সোমবার বিকেলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ও ট্রানজিট রুটে চলাচলকারী বিভিন্ন এয়ারলাইনসের মোট ৫১টি ফ্লাইটে প্রভাব পড়েছে। এর ফলে কিছু ফ্লাইট বাতিল এবং কিছু স্থগিত করা হয়েছে। এই পরিস্থিতির কারণে ঢাকা থেকে সৌদি আরবের বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার কথা ছিল এমন ৫ হাজার ৪১৮ জন যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
বেবিচকের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, এই ৫১টি ফ্লাইটের মধ্যে সৌদি আরবের সঙ্গে সরাসরি চলাচলকারী ফ্লাইট ১২টি এবং বাকি ৩৯টি ট্রানজিট ফ্লাইট। সরাসরি চলাচলকারী ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের চারটি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের দুটি, সৌদিয়া এয়ারলাইনসের তিনটি এবং রিয়াদ এয়ারের তিনটি ফ্লাইট রয়েছে।
এদিকে বেসরকারি উড়োজাহাজ সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, রিয়াদ বিমানবন্দর বন্ধ থাকার কারণে আগামী ২১ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা রুটের তাদের সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।