গত আগস্টে স্বাক্ষরিত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো কার্যকর হলো সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যকার ‘মক্কা চুক্তি’। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানকে আরও শক্তিশালী করতে সৌদি আরবে পাকিস্তানি ও তুর্কি সেনা মোতায়েনের বিষয়ে একমত হয়েছে এই প্রতিরক্ষা জোট।

গত সোমবার রিয়াদে জোটের শীর্ষ কমিটির এক জরুরি বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ‘সম্মিলিত প্রতিরক্ষা অঙ্গীকারের কার্যকর বাস্তবায়নে কমিটি অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অনুমোদিত চুক্তি এবং নিজ নিজ দেশের আইন মেনে যৌথ সামরিক বাহিনী ও সক্ষমতার জোগানসহ সৌদি আরবে এর দ্রুত মোতায়েন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’ তবে এই সামরিক বহরের আকার বা তাদের মূল দায়িত্ব কী হবে, সে বিষয়ে বিবৃতিতে কোনো স্পষ্ট উল্লেখ নেই।

পাকিস্তানের অবস্থান পরিষ্কার হলেও তুরস্কের ভূমিকা এখনো রহস্যজনক। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ তুর্কি বাহিনীর উপস্থিতির কথা জানালেও আঙ্কারা আনুষ্ঠানিকভাবে সৌদি আরবে সেনা মোতায়েনের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।

এদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালকি জানিয়েছেন, গত মাসে হুতিদের দখলে যাওয়া এলাকাগুলো পুনরুদ্ধারে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার একটি পাল্টা অভিযান শুরু করেছে। এই অভিযানে সহায়তা করতে ১০০টি যুদ্ধবিমান নিয়োজিত রয়েছে।

রিয়াদের জরুরি বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা পরেই পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ জানান, পাকিস্তানি বাহিনী ইতিমধ্যে সেখানে তাদের ভূমিকা পালন শুরু করেছে। সোমবার রাতে রিয়াদ থেকে জিও নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘তুরস্ক ও পাকিস্তানের বাহিনী এখানে একটি সহায়কের ভূমিকা পালন করছে। আমরা নিশ্চিতভাবেই রিকনেসান্স বা শত্রুশিবিরের তথ্য সংগ্রহ এবং এ জাতীয় কাজের সঙ্গে জড়িত। তবে মূল লড়াই মূলত সৌদি আরবের নিজস্ব বাহিনীই লড়ছে এবং তারাই এলাকাগুলো পুনরুদ্ধার করছে।’

এই সিদ্ধান্তের ফলে সৌদি আরবের আক্রমণাত্মক অভিযানের বিপরীতে পাকিস্তানের ভূমিকা আপাতত প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানেই সীমাবদ্ধ থাকছে। তবে বিশ্লেষকেরা আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, এই পরিস্থিতি ইসলামাবাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে, যার উত্তর তারা এখনো প্রকাশ্যে দেয়নি। প্রশ্নটি হলো, পাকিস্তানের পক্ষে কত দিন এই প্রত্যক্ষ লড়াইয়ের বাইরে থাকা সম্ভব?

সৌদি আরবে পাকিস্তানের সামরিক উপস্থিতি নতুন কিছু নয়। ১৯৬৭ সাল থেকেই দেশটি সৌদি সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালের এক চুক্তির মাধ্যমে দেশটিতে পাকিস্তানি সেনা প্রেরণের বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর ১৯৮৫ সালের জুনের একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে সময় তাবুকে একটি আর্মার্ড ব্রিগেডসহ সৌদি সেনাবাহিনীতে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার পাকিস্তানি সদস্য কর্মরত ছিলেন। এছাড়া ১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়ও প্রতিরক্ষামূলক দায়িত্ব পালনের জন্য সৌদি আরবে একটি বড় সামরিক দল পাঠিয়েছিল পাকিস্তান।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের সঙ্গে একটি ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করে পাকিস্তান। এই চুক্তি অনুযায়ী, যেকোনো এক দেশের ওপর হামলাকে দুই দেশের ওপরই হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলে রিয়াদ নিশ্চিত করেছে যে, ফাইটার ও সাপোর্ট এয়ারক্রাফটসহ পাকিস্তানের একটি সামরিক বহর ‘ইস্টার্ন প্রভিন্স’-এর কিং আবদুল আজিজ বিমানঘাঁটিতে পৌঁছেছে। তবে বর্তমানে ঠিক কতজন পাকিস্তানি সেনা সৌদি আরবে অবস্থান করছেন, তা কখনোই প্রকাশ করা হয়নি।

তেহরান এই পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। রোববার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ইয়েমেনে যুদ্ধের জন্য পাকিস্তানের সেনা মোতায়েনের খবর সত্য নয়—তেহরান এমনটাই আশা করছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, নতুন করে কোনো হস্তক্ষেপ হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।

গত সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস (আইএসপিআর)-এর মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী সৌদি গণমাধ্যম আরব নিউজকে বলেন, সৌদি আরব ও এর পবিত্র স্থানগুলোর সুরক্ষায় পাকিস্তানি বাহিনী ইতিমধ্যে সেখানে মোতায়েন রয়েছে। সাক্ষাৎকারে আহমেদ শরিফ চৌধুরী জোর দিয়ে বলেন, “আমি এখানে ‘সশরীর’ শব্দটির ওপর গুরুত্ব দিতে চাই। আমরা যেকোনো সীমা পর্যন্ত যেতে প্রস্তুত।”

তবে রিয়াদে হওয়া নতুন সেনা মোতায়েন চুক্তির (মক্কা চুক্তি) বিষয়ে আল-জাজিরার মন্তব্যের অনুরোধে আইএসপিআর কোনো সাড়া দেয়নি। এদিকে গতকাল মঙ্গলবার পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্টে জানায়, সৌদি আরব এবং এর পবিত্র স্থানগুলোর সুরক্ষায় পাকিস্তানের প্রতিশ্রুতি নিয়ে কোনো আপস হবে না। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘সম্মিলিত প্রতিরোধব্যবস্থা বাস্তবায়নের কৌশলগত খুঁটিনাটি বিষয়গুলো সম্পূর্ণ গোপনীয় সামরিক বিষয়। তাই এ নিয়ে গণমাধ্যমে জল্পনাকল্পনার কোনো সুযোগ নেই।’

তুরস্কের ভূমিকা নিয়ে ইস্তাম্বুলের ইবনে খালদুন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ গোখান এরেলি আল-জাজিরাকে বলেন, ‘সৌদি আরবে তুরস্কের স্থায়ী সেনা মোতায়েনের বিষয়ে প্রকাশ্যে স্বীকৃত কোনো তথ্য নেই।’ তিনি তুরস্কের সংবিধানের ৯২ নম্বর অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে জানান, বিদেশে সেনা পাঠানোর ক্ষমতা শুধু দেশটির সংসদের হাতে রয়েছে এবং তুর্কি সংসদ এখনো ‘মক্কা চুক্তি’ অনুমোদন করেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের সেনা মোতায়েন যদি পুরোপুরি প্রতিরক্ষামূলক হয় এবং সৌদি স্থাপনাগুলো রক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তেহরান তা মেনে নিতে পারে। তবে পাকিস্তান যদি হুতিদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অভিযানে যোগ দেয়, তবে ইরান এটিকে একটি রেড লাইন বা সীমারেখা হিসেবে দেখবে। কারণ, আরব উপদ্বীপে হুতিদের ইরান তার কৌশলগত প্রভাববলয়ের অংশ হিসেবে দেখে থাকে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের নির্বাহী পরিচালক দানিয়া থাফের বলেন, রিয়াদ এই চুক্তিকে একটি কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থায় রূপ দিতে চাইছে। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘সৌদি আরব মক্কা চুক্তিকে শুধু একটি রাজনৈতিক ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একে একটি প্রকৃত প্রতিরোধব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।’ দানিয়া থাফেরের মতে, রিয়াদ আপাতত মূলত তাদের আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে এবং সৌদি ভূখণ্ড রক্ষায় পাকিস্তান ও তুরস্কের সহায়তা চাইছে। এর উদ্দেশ্য হলো, হুতিদের এটি বুঝিয়ে দেওয়া যে আরেকটি হামলা চালানো এখন আর শুধু সৌদি ও হুতিদের মধ্যকার একক কোনো বিষয় থাকবে না।

ইরান যুদ্ধের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে ট্রানজিট বা জাহাজ চলাচলে তেহরানের বিধিনিষেধের কারণে রিয়াদ তেল রপ্তানিতে ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’ ব্যবহার করে আসছিল। এর মধ্যেই হুতিরা সৌদি আরবের একাধিক শহর ও স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। সোমবার সন্ধ্যায় সৌদি আরবের দুটি বিমানবন্দরে হামলা হওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ, যাতে অন্তত তিনজন আহত হয়েছেন।

তবে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান এ জরুরি বৈঠকের যে বিবরণ দিয়েছেন, তা দানিয়া থাফেরের পূর্বাভাসের চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘হামলা এবং এর জন্য দায়ী সবার বিরুদ্ধে জোটের কাঠামোর মধ্যে থেকে সম্মিলিত প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ চালুর বিষয়ে কমিটি একমত হয়েছে।’

দানিয়া থাফের মনে করেন, ‘দায়ী সবাই’ শব্দবন্ধটি অত্যন্ত সচেতনভাবে এবং অস্পষ্ট রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে হুতিদের এই বার্তাই দেওয়া হচ্ছে যে সৌদি আরব শুধু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে; বরং এই হামলার পেছনে ইন্ধনদাতা বা সাহায্যকারী যেকোনো পক্ষ বা অবকাঠামোর ওপরও আঘাত হানতে পারে। এটি বাইরের পৃষ্ঠপোষকদের প্রতিও একটি পরোক্ষ সতর্কবার্তা যে রিয়াদ পুরো নেটওয়ার্কের ওপরই নজর রাখছে।

এই বিষয়ে পাকিস্তানের কর্মকর্তারা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। ২ অক্টোবর ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেন, ‘চুক্তিপত্রেই বলা হয়েছে, এটি মূলত প্রতিরক্ষামূলক প্রকৃতির। এর আক্রমণাত্মক কোনো উদ্দেশ্য নেই।’

ইসলামাবাদভিত্তিক ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ সহযোগী ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার তুঘরাল ইয়ামিন জানান, পাকিস্তানের এই সামরিক অবদান বিশাল কোনো বাহিনীর চেয়ে বিশেষায়িত কোনো ইউনিটের হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান সম্ভবত তাদের বর্তমান সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করতে আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট, ড্রোন, যুদ্ধক্ষেত্রের যোগাযোগব্যবস্থা ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের পাঠাতে পারে। এর বাইরে মাইন বা বোমা পাতা ও তা অপসারণের জন্য কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্সের সদস্য এবং কিছু স্পেশাল সার্ভিস বা বিশেষায়িত সেনা পাঠানো হতে পারে। এর চেয়ে বেশি কিছু হবে বলে আমি মনে করি না।’

তুরস্কের ভূমিকাও একইভাবে সীমিত থাকবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ গোখান এরেলি। তিনি বলেন, ‘বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হবে পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং মূলত স্থলভিত্তিক নয়। এর মধ্যে থাকবে কূটনৈতিক সমন্বয়, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, জরুরিভিত্তিতে আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ, ড্রোন ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ কৌশল দিয়ে সহায়তা। এ ছাড়া নৌবাহিনী বা আকাশ প্রতিরক্ষার কিছু সরঞ্জামও দেওয়া হতে পারে।’

দানিয়া থাফের বলেন, বর্তমানে পাশাপাশি দুটি অভিযান চলছে। তিনি আরও বলেন, ‘আসলে দুটি পরস্পরসংলগ্ন অভিযান চলছে। প্রথমটি সৌদি আরবকে রক্ষা করা। দ্বিতীয়টি, ইয়েমেনের ভেতরে সামরিক ভারসাম্য বদলে দেওয়া, যাতে ক্রমশ শক্তিশালী অবস্থান থেকে হুতিরা সৌদি ভূখণ্ডে হামলা চালিয়ে যেতে না পারে।’

পাকিস্তান তাদের ভূমিকা ঠিক কোথায় শেষ হবে, তা প্রকাশ্যে জানায়নি। ৩০ সেপ্টেম্বর রোমে সাংবাদিকেরা খাজা আসিফকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, পাকিস্তানি বাহিনী ইয়েমেনে হামলায় যোগ দিয়েছে কি না। তিনি সরাসরি প্রশ্নটির উত্তর না দিয়ে বলেন, ‘আমি বিস্তারিত বলছি না। তবে অবশ্যই, যখন আমি বলছি যে সৌদি আরবকে রক্ষা করতে আমরা এ ব্যবস্থার আওতাভুক্ত, তার অর্থ হলো, আমাদের হাতে থাকা যেসব উপায় রয়েছে, সেগুলো সৌদি আরবের জন্যও ব্যবহার করা যাবে।’

পাকিস্তান আগেও এ ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। ২০১৫ সালের এপ্রিলে দেশটির পার্লামেন্ট সর্বসম্মতভাবে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে বলেছিল, ‘সংকট অবসানে সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকা পালনের সক্ষমতা বজায় রাখতে ইয়েমেন সংঘাতে পাকিস্তানের নিরপেক্ষ থাকা উচিত।’ তবে প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছিল, সৌদি আরবের ভৌগোলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘিত হলে বা পবিত্র স্থানগুলো হুমকির মুখে পড়লে পাকিস্তান সৌদি আরবের পাশে থাকবে। সোমবারের যৌথ বিবৃতিতেও একই ধরনের যুক্তিতে সেনা মোতায়েনের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে এবং পবিত্র মক্কা ও মদিনাকে লক্ষ্য করে চালানো হামলার চেষ্টার নিন্দা জানানো হয়েছে।

তেহরান বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। রোববার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ইয়েমেনে যুদ্ধের জন্য পাকিস্তানের সেনা মোতায়েনের খবর সত্য নয়—তেহরান এমনটাই আশা করছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, নতুন করে কোনো হস্তক্ষেপ হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।

গত সপ্তাহের সংবাদ সম্মেলনে ইসহাক দার জানান, সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে নিউইয়র্কে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে তিনি মক্কা চুক্তি নিয়ে আলোচনা করেছেন। ইসহাক দার বলেন, ‘আমি তাঁদের জানিয়েছি যে আমরা একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় আছি। মুসলিম হিসেবে আমাদের এটি মেনে চলতে হবে। ইনশা আল্লাহ, আমরা তা করব।’ দার জানান, ইরানের নেতারা সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে রাজনৈতিকভাবে হুতিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে সোমবারের বিবৃতিতে রাজনৈতিক উদ্যোগের কোনো উল্লেখ ছিল না।

তেহরানের পার্সিয়ান গালফ স্টাডিজ গ্রুপের বিশ্লেষক জাভাদ হেইরান-নিয়া বলেন, সৌদি আরবের ভূখণ্ড ও অবকাঠামো রক্ষা করা এবং ইয়েমেনে হুতিদের ওপর হামলা চালানোর মধ্যে ইরান স্পষ্ট পার্থক্য করে। জাভাদ আল-জাজিরাকে বলেন, ‘সাধারণভাবে বলতে গেলে, পাকিস্তানের সেনা মোতায়েন যদি পুরোপুরি প্রতিরক্ষামূলক হয় এবং সৌদি স্থাপনাগুলো রক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তেহরান তা মেনে নিতে পারে। তবে পাকিস্তান যদি হুতিদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অভিযানে যোগ দেয়, তবে ইরান এটিকে একটি রেডলাইন বা সীমারেখা হিসেবে দেখবে। কারণ, আরব উপদ্বীপে হুতিদের ইরান তার কৌশলগত প্রভাববলয়ের অংশ হিসেবে দেখে থাকে।’ জাভাদ আরও বলেন, ‘বর্তমানে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার ভূমিকা নিরপেক্ষতা থেকে সরে গিয়ে বিরোধপূর্ণ স্বার্থের ব্যবস্থাপনায় চলে গেছে। ফলে দেশটির বিশ্বাসযোগ্যতা অত্যন্ত নাজুক।’

ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজের ইয়ামিনও বলেন, ‘এখন দায়িত্ব ইসলামাবাদের ওপর।’ তিনি বলেন, ‘হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পাকিস্তানি সেনারা যাতে জড়িয়ে না পড়েন, সে জন্য ইসলামাবাদকে সতর্কতার সঙ্গে নিজেদের সীমারেখা নির্ধারণ করতে হবে। তাই প্রশ্নটা হওয়া উচিত নয় যে তারা কীভাবে এতে জড়াবে; বরং কীভাবে তারা এতে জড়িয়ে পড়া ঠেকাতে পারে।’

ইয়েমেন নিয়ে রিয়াদ কী চায়, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। থাফের বলেন, ‘সম্ভবত রিয়াদ এমন একটি স্বল্পমেয়াদি, উচ্চমাত্রার অভিযান চায়, যার মাধ্যমে (হুতিদের বিরুদ্ধে) প্রতিরোধক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা যাবে। তারা আরেকটি অনির্দিষ্টকাল ধরে চলা ইয়েমেন যুদ্ধ চায় না।’

তবে ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী চলতি সপ্তাহে বলেছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হুতিদের দখলে যাওয়া এলাকা পুনরুদ্ধারের মধ্যেই তাদের লক্ষ্য সীমাবদ্ধ নেই; বরং ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীটির দখলে থাকা রাজধানী সানা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য তাদের। ২০১৪ সাল থেকে সানা হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। থাফের বলেন, ‘সামরিক অভিযান কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নির্ভর করে লক্ষ্য কী, তার ওপর। সৌদি ভূখণ্ড ও বাব আল-মানদেবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অভিযান সীমিত রাখা সম্ভব। কিন্তু হুতিদের পুরোপুরি পরাজিত করার চেষ্টা বা সানা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য নেওয়া হলে সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং সম্ভাব্যভাবে অনেক দীর্ঘ যুদ্ধ হয়ে উঠবে।’