মধ্যপ্রাচ্য আবারও এক ভয়াবহ সংকটের মুখে। লোহিত সাগর উপকূলে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় সামরিক সাফল্য দেখিয়েছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছে বৃহৎ ও ক্ষুদ্র হানিশ দ্বীপপুঞ্জ দখলের পর তারা এখন মোখা শহরের দিকে এগোচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে এক দশক পুরোনো ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ নতুন মাত্রা পেয়েছে।

এদিকে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরের মাত্র এক মাসের মাথায় প্রথম বাস্তব পরীক্ষার মুখে পড়েছে। চুক্তির মূল শর্ত অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণ হলে তা সব দেশের ওপর আক্রমণ বলে গণ্য হবে।

পাকিস্তান বারবার বলেছে, চুক্তিটি সম্পূর্ণ আত্মরক্ষামূলক; এটি কোনো যুদ্ধে জড়ানোর আহ্বান নয়। কিন্তু এখন সেই অবস্থান প্রমাণের সময় এসেছে। হুতিদের অগ্রযাত্রার জবাবে সৌদি আরব গত দুই সপ্তাহে প্রায় ৩০০টি বিমান হামলা চালিয়েছে। এতে প্রাণহানি বাড়ছে এবং সৌদি তেলের বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

১৬ সেপ্টেম্বর মক্কা অভিমুখে একটি হুতি ড্রোন ধ্বংস করে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। মক্কার আধ্যাত্মিক গুরুত্বের কারণে এটিকে সর্বোচ্চ হুমকি হিসেবে দেখছে রিয়াদ। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ তখন জানান, ‘মক্কা চুক্তি আমাদের ওপরও কার্যকর হয় এবং আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করব।’

তবে এরপরও পাকিস্তান সামরিকভাবে চুক্তিটি কার্যকর করার কোনো সক্রিয় পদক্ষেপ নেয়নি। ১০ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান জানিয়ে দেয়, তাৎক্ষণিক সামরিক প্রতিক্রিয়া নয়, কূটনীতিতে নজর রাখবে তারা। ১৭-১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এপিকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তুর্কি ও পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রিয়াদ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সাহায্য চায়নি। তবে রিয়াদ অন্য পথ খুঁজছে। ওমান ও মিসর কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে। তুরস্কের ক্ষেত্রে অক্টোবরের আগে সংসদে চুক্তিটি অনুমোদনের সম্ভাবনা কম, ফলে তারা আইনি জটিলতায় রয়েছে।

এদিকে সৌদি আরব বিকল্প সমীকরণ খুঁজছে। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে দুবার হুতিদের ওপর মার্কিন বিমান হামলার আহ্বান জানিয়েছেন বলে জানা গেছে। ট্রাম্প সরাসরি হামলা না করলেও গোয়েন্দা তথ্য দিতে রাজি হয়েছেন। রিয়াদ ইসরায়েল ও ব্রিটেনের দরজায়ও নক করছে বলে খবর। বিশ্লেষক স্টিভেন এ কুকসহ অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, চুক্তির পর সামরিক অগ্রগতি না থাকায় এক মাসেই এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।

সমস্যা হলো, পাকিস্তান যে সংযম দেখাচ্ছে, রিয়াদ তা একাকী ফেলে রাখার শামিল মনে করছে। তবে পাকিস্তান যে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় তা নয়। সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় পাকিস্তানের প্রায় ১৬টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও সেনাসদস্য সৌদি ভূখণ্ডে মোতায়েন আছে। ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির রিয়াদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছেন। এই কূটনীতির মাধ্যমে রিয়াদের প্রতি অঙ্গীকার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং তেহরানের ওপর চাপ তৈরি করা হচ্ছে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে আনতে।

পাকিস্তান একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য করতে চাইছে: সৌদি ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষা, আকাশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, সেনা মোতায়েন—এগুলো এক বিষয়; আর ইয়েমেনের ভেতরে গিয়ে আক্রমণাত্মক হামলায় অংশ নেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। মক্কা চুক্তির ঘোষিত উদ্দেশ্য যৌথ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সামরিক প্রযুক্তিতে সহযোগিতা—প্রথমটিকে সমর্থন করে, দ্বিতীয়টির বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না।

সামরিক সমাধান এ সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়। পাকিস্তানের ইরানের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাও জরুরি। ইয়েমেন যেন সৌদি-ইরান সরাসরি যুদ্ধের কারণ না হয়, সেদিকে নজর রাখছে পাকিস্তান। এ কারণেই আসিম মুনির ও আব্বাস আরাগচির কূটনীতি তাৎপর্যপূর্ণ।

চীনের ভূমিকাও প্রাসঙ্গিক। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে লোহিত সাগরে হুতিদের হামলা কমাতে ইরানের ওপর চাপ দিয়েছিল চীন, এমনকি বাণিজ্যিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার হুমকিও দিয়েছিল। বৈশ্বিক বাণিজ্যে লোহিত সাগরের গুরুত্ব বিবেচনায় বেইজিং আবারও একই উদ্যোগ নিতে পারে। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি-ইরান সম্পর্কের উন্নতি ঘটেছিল, যা দেখায় যে মধ্যস্থতায় বেইজিং স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

ইয়েমেনের ভেতরে পাকিস্তানের সামরিক উপস্থিতি পাল্টা হামলার ঝুঁকি বাড়াবে, ইরানের সঙ্গে সম্পর্কে ফাটল ধরাবে, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উস্কে দেবে এবং একটি প্রতিরক্ষামূলক জোটকে টেনে আনবে অনির্দিষ্টকালের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে। সব পক্ষের স্বার্থের হিসাব মেলেনি, তবে কেউই নতুন যুদ্ধ চায় না। সৌদি আরব চায় নিরাপত্তা, ইরান চায় প্রভাব, চীন চায় বাণিজ্যিক নৌপথের নিরাপত্তা, পাকিস্তান চায় সৌদি বন্ধুত্ব বজায় রেখে ইরানের সঙ্গে সংঘাত এড়াতে, আর তুরস্ক চায় আঞ্চলিক প্রভাব। ওমান-মিসরের মধ্যস্থতা ও মুনির-আরাগচি যোগাযোগ স্পষ্ট করে যে সবাই পরিস্থিতি সীমিত রাখতে চায়।

ইয়েমেন সংকটের একটি পাকিস্তানি মাত্রাও আছে। বাব আল-মানদেব প্রণালি সরাসরি আরব সাগরে মিশেছে, ফলে করাচি বন্দর, গওয়াদর বন্দর (সিপেকের প্রাণকেন্দ্র) এবং পাকিস্তানের সমুদ্রসীমা সংকট থেকে দূরে নয়। লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে পণ্য পরিবহন খরচ ও ইনস্যুরেন্স প্রিমিয়াম বেড়ে যায়, যা বিকল্প পথ খোঁজার তাগিদ তৈরি করে। সিপেকের জন্য গওয়াদরের গুরুত্ব বাড়লেও বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিও তৈরি করে।

পাকিস্তানের আসল পরীক্ষা তখনই, যদি রিয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে ইয়েমেনে সামরিক অভিযানে অংশ নিতে অনুরোধ করে। সেক্ষেত্রে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা ভেস্তে যাবে। তবে মক্কা চুক্তির প্রকৃত পরীক্ষা ইয়েমেনের মাটিতে সেনা নামানো নয়, বরং এখনই—যুদ্ধে না জড়িয়েও মোতায়েন থাকা বিমান স্কোয়াড্রন, আকাশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং ইরানের ওপর কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরক্ষাবলয় তৈরি করতে পারছে কি না।

এখন পর্যন্ত পাকিস্তান সংযম দেখিয়েছে, কিন্তু রিয়াদের কাছে তা পাশে না পাওয়ার মতো মনে হতে পারে। ওয়াশিংটন, তেল আবিব ও লন্ডনে ফোন গেলে যখন চুক্তির সঙ্গীরা নীরব, তখন তা সংযম নয়, বরং সময়ের প্রয়োজনে পাশে না পাওয়া বলেই মনে হতে পারে। এই দুই ভিন্ন ব্যাখ্যাই মক্কা চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে। ইতিহাস মনে রাখবে, এই সংকট পাকিস্তানকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল নাকি কাগজে-কলমে থাকা চুক্তি হিসেবে প্রথম পরীক্ষাতেই থমকে গিয়েছিল।

মনসুর কায়সার ইসলামাবাদভিত্তিক পররাষ্ট্র ও কূটনীতিবিষয়ক লেখক। মিডল ইস্ট মনিটর থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।