ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্রমবর্ধমান হামলা মোকাবিলায় ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র আওতায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান। এই চুক্তির অধীনে সৌদি আরবে দ্রুত সেনা মোতায়েন করতে একমত হয়েছে তিন দেশ।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে তিন দেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক জরুরি বৈঠকের পর গতকাল সোমবার এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। গত ৭ আগস্ট ‘মক্কা ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ বা ‘মক্কা প্রতিরক্ষা জোট’ নামের এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তির পর এই প্রথমবার এর বাস্তব কার্যকারিতা শুরু হলো।
চুক্তিটির মূল শর্ত অনুযায়ী, জোটভুক্ত তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলা হলে তা সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট বা ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাকালীন সনদের একটি মূল ধারার সঙ্গে এই চুক্তির হুবহু মিল লক্ষ্য করা যায়।
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনী গত মাসে হুতিদের দখল করা এলাকাগুলো পুনর্দখলের জন্য একটি পাল্টা অভিযান শুরু করে। সেই অভিযানের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই সামরিক পদক্ষেপের ঘোষণা এল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান জানান, ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতিদের হামলা এবং এর পেছনে যারা জড়িত, তাদের জবাব দিতে এ জোটের আওতায় “সম্মিলিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা” সক্রিয় করার বিষয়ে কমিটি একমত হয়েছে।
খালিদ বিন সালমান আরও বলেন, “এ জোট সৌদি আরব এবং পবিত্র স্থানগুলোর ওপর হওয়া হামলা মোকাবিলায় তিন দেশের সংহতি ও ঐক্য আবারও দৃঢ় করেছে।”
অন্যদিকে, পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত একটি পৃথক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী তিন দেশ তাদের পূর্বনির্ধারিত সামরিক শক্তি ও সক্ষমতার জোগান দেবে এবং সৌদি আরবে দ্রুত সেনা মোতায়েন নিশ্চিত করবে। বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, এই অঙ্গীকারগুলো অনুমোদিত চুক্তি ও প্রতিটি দেশের নিজস্ব আইন মেনেই বাস্তবায়ন করা হবে।
উল্লেখ্য, সৌদি আরবের সমর্থনপুষ্ট ইয়েমেনি বাহিনী জানিয়েছে, তারা লোহিত সাগরের বন্দরনগরী মোখা পুনর্দখল করেছে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন তাদের হাতে। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর চলতি অভিযানে নিজেদের অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। জানানো হয়েছে, তাদের ১০০টি যুদ্ধবিমান এই অভিযানে সহায়তা প্রদান করছে।
এদিকে, হুতিরা দাবি করেছে যে তারা রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং উপকূলীয় শহর রাবিগের আরামকো তেল শোধনাগারে হামলা চালিয়েছে। গোষ্ঠীটি আরও দাবি করেছে, তারা একটি বিমানবন্দর ও একটি বিমানঘাঁটিসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। তবে রিয়াদের পক্ষ থেকে হুতিদের এই দাবির বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পর্কে জানা গেছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র হতে থাকা সংঘাতের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই এই জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটে। গত আগস্টে চুক্তি সই হওয়ার পর থেকেই ইয়েমেনে হুতিদের অভিযান এবং সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা শুরু হয়।
২০২৬ সালের গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স অনুযায়ী, এই জোটের তিন সদস্য দেশের সম্মিলিত সক্রিয় সেনা সদস্যের সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। এছাড়া তাদের সংগ্রহে রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৪০০টি সামরিক বিমান, ৬ হাজার ট্যাংক এবং ৩৪০টিরও বেশি নৌযুদ্ধের সরঞ্জাম।
শুরুর দিকে চুক্তিতে প্রতিটি দেশের সামরিক দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, তবে পরবর্তীতে জোটটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া হয়। সেপ্টেম্বরের শুরুতে সৌদি আরবের দিকে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছিলেন, সৌদি আরবের ওপর হামলা হলে এই চুক্তি কার্যকর হতে পারে।
পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম জিও নিউজকে খাজা আসিফ তখন বলেছিলেন, “যদি কোনো উসকানি ছাড়াই আগ্রাসন চালানো হয় কিংবা ইয়েমেনে যা ঘটছে তার আঁচ সৌদি আরবে এসে পড়ে, তবে মক্কা চুক্তি অবশ্যই কার্যকর হবে।” গতকালের আগ পর্যন্ত এই জোট কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের জ্যেষ্ঠ নন-রেসিডেন্ট ফেলো আবদুল আজিজ আলঘাশিয়ান বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি সক্রিয় করার এই সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।
আল-জাজিরাকে আলঘাশিয়ান বলেন, “সাম্প্রতিক সপ্তাহ ও মাসগুলোতে হুতিদের হামলা এবং উসকানি মূলত মক্কা জোটের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে। এমনকি এটিকে অনুপ্রাণিতও করেছে।” তিনি মন্তব্য করেন যে, এই হামলাগুলো জোটের সাংগঠনিক কাঠামোকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছে।
আলঘাশিয়ান আরও বলেন, এই ঘটনাপ্রবাহ থেকে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে ওঠার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, “আমরা প্রায়ই আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর কথা বলি, যা শুনতে বেশ চমৎকার লাগে। কিন্তু অনেক সময়ই এটি ফাঁপা শোনায় এবং এর বিস্তারিত অর্থ অনেকে বোঝেন না। তবে আমার মনে হয়, এখন আমরা এটি বাস্তবে রূপ নিতে দেখছি। এই অঞ্চলের ইতিহাসে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ।”