আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শুরু হওয়া চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারার প্রক্রিয়াটি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গতি পায়। সেই ধারাবাহিকতায় এখন নির্বাচিত বিএনপি সরকারের আমলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের খ্যাতনামা বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি হতে যাচ্ছে।
আজ বৃহস্পতিবার বেলা তিনটায় ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ মিলনায়তনে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, আগামী ১৫ বছর এই টার্মিনালটি পরিচালনা করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। প্রতিষ্ঠানটি ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে মাশুল আদায়ের দায়িত্ব পালন করবে। এর বিনিময়ে বন্দর কর্তৃপক্ষকে এককালীন নির্দিষ্ট অর্থ এবং প্রতিটি কনটেইনারের বিপরীতে নির্দিষ্ট মাশুল প্রদান করবে তারা। তবে সরকার এখন পর্যন্ত চুক্তির বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
এই চুক্তি কার্যকর হলে এনসিটি হবে চট্টগ্রাম বন্দরের তৃতীয় কনটেইনার টার্মিনাল যা বিদেশি অপারেটরের হাতে ছেড়ে দেওয়া হলো। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নির্মিত পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান আরএসজিটি-কে। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে লালদিয়ায় কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের মায়ের্সকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস নিয়োগ পায়। একই সময়ে সুইজারল্যান্ডের মেডলগের কাছে ইজারা দেওয়া হয় কেরানীগঞ্জের পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল। বিদেশি অপারেটরদের হাতে ছেড়ে দেওয়া এই টার্মিনালগুলো ছাড়াও বন্দরে আরও দুটি টার্মিনাল রয়েছে, যা বর্তমানে দেশীয় অপারেটররা পরিচালনা করছে।
২০০৭ সালে নির্মাণকাজ শেষ হওয়া প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ নিউমুরিং টার্মিনালে একসঙ্গে চারটি সমুদ্রগামী এবং একটি ছোট কনটেইনার জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব। নির্মাণের পর প্রথমে আংশিক এবং পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গভাবে টার্মিনালটি চালু করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে দেশীয় অপারেটরদের সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এটি পরিচালিত হয়ে আসছিল। মূলত জাহাজে রপ্তানি কনটেইনার তোলা এবং জাহাজ থেকে আমদানি কনটেইনার নামানোর কাজ এখানে সম্পন্ন হয়।
২০০৮ সালে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে এই টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় বিশ্বের শীর্ষ চারটি বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে বাছাই করা হয়। সেই তালিকায় ছিল যুক্তরাজ্যের পিঅ্যান্ডও, যাকে পরবর্তীতে ডিপি ওয়ার্ল্ড অধিগ্রহণ করে। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ওই নিয়োগ প্রক্রিয়াটি বাতিল করা হয়।
পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই টার্মিনালটি ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু হয়। ২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি আবুধাবিতে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এই সমঝোতাটি হয়েছিল দুবাই সরকার এবং বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষের (পিপিপি কর্তৃপক্ষ) মধ্যে। ২০২৩ সালের ৩ এপ্রিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর এনসিটি ইজারা দেওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া আরও সামনে এগিয়ে যায়।
২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এই সরকারের সময়ে ইজারার প্রক্রিয়াটি দ্রুত গতি পায়। সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাবের মূল্যায়ন সম্পন্ন করা হয় এবং এরপর শুরু হয় দর-কষাকষি। চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই দর-কষাকষি প্রক্রিয়া চলে।
অন্তর্বর্তী সরকার চুক্তির প্রস্তুতি চূড়ান্ত করলেও সেই সময়ে বন্দরে শ্রমিক আন্দোলন শুরু হয়। পরবর্তীতে ৮ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশিক চৌধুরী জানান, “ডিপি ওয়ার্ল্ড খসড়া চুক্তি পর্যালোচনার জন্য সময় চেয়েছে।” সে সময় সরকারের মেয়াদ আর মাত্র দুই কার্যদিবস বাকি থাকায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চুক্তিটি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।
গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্থগিত হওয়া ইজারার প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু হয়। গত ৮ এপ্রিল দুই পক্ষের যৌথ প্ল্যাটফর্মের সভার পর ডিপি ওয়ার্ল্ড নতুন করে প্রস্তাব পেশ করে। সেই প্রস্তাবের কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন শেষে দর-কষাকষি চূড়ান্ত করা হয়। ১ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি টার্মিনালটি ১৫ বছরের জন্য বিদেশি অপারেটরের মাধ্যমে পরিচালনার রেয়াতি চুক্তির খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদন দেয়।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এনসিটি ইজারার বিরুদ্ধে বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের ব্যানারে আন্দোলন শুরু হলে বন্দরে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। সে সময় নির্বাচিত সরকারের অধীনে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি ওঠে। বর্তমানে নির্বাচিত সরকারের আমলেও ইজারার বিরুদ্ধে বন্দর রক্ষা আন্দোলনের ব্যানারে শ্রমিক-কর্মচারীরা সরব। গত সোমবার এক অবস্থান কর্মসূচিতে বন্দর রক্ষা আন্দোলনের নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এনসিটি ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ বাতিল না হলে বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হবে। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল বুধবার বন্দর এলাকায় মশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।
গত অর্থবছরে নিউমুরিং টার্মিনালে প্রায় ১৩ লাখ ৮৫ হাজার একক কনটেইনার ওঠানো-নামানো হয়েছে, যা বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশ। ডিপি ওয়ার্ল্ড দায়িত্ব নিলে কনটেইনার পরিবহন কতটা বাড়বে, তা নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা চলছে।
ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের শীর্ষ ১০ বন্দর অপারেটরের একটি হলেও এনসিটির সক্ষমতা বাড়াতে প্রতিষ্ঠানটিকে অবকাঠামো খাতে নতুন বিনিয়োগ করতে হবে বলে মনে করেন বন্দর পর্ষদের সাবেক সদস্য জাফর আলম। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ডিপি ওয়ার্ল্ড অনেক আগেই অবকাঠামো খাতে এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিল।”
তিনি আরও মনে করেন, এনসিটির পূর্ণ সুফল পেতে টার্মিনালের পাশাপাশি বন্দর থেকে কনটেইনার আনা-নেওয়ার পথে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হবে। এজন্য উৎপাদন অঞ্চলের কাছে প্রস্তাবিত ধীরাশ্রম অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) ও তার সঙ্গে রেল যোগাযোগে বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। এতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের পরিচালনদক্ষতা বাড়বে এবং আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যেও সুফল আসবে।