চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বাতিলের দাবি জানিয়েছেন বন্দর রক্ষা আন্দোলনের নেতারা। এই দাবি মেনে না নেওয়া হলে আগামী ৮ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দরের যাবতীয় কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা।
আজ সোমবার সকালে বন্দরের প্রশাসনিক ভবনের সামনে এক অবস্থান কর্মসূচির মাধ্যমে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটির ব্যানারে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে সরকারদলীয় শ্রমিক সংগঠনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
আন্দোলনকারীদের এই অবস্থান কর্মসূচির ফলে বেলা দেড়টা পর্যন্ত বন্দরের প্রশাসনিক ভবনের দিকে যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেখানে পুলিশ, বন্দর নিরাপত্তা বিভাগ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন ছিলেন।
উল্লেখ্য যে, গত ১ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির এক বৈঠকে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালটি ১৫ বছরের জন্য বিদেশি অপারেটরের মাধ্যমে পরিচালনার লক্ষ্যে রেয়াতি চুক্তির খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদন করা হয়েছে। বর্তমানে কিছু দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে চূড়ান্ত চুক্তির দিকে এগোচ্ছে কর্তৃপক্ষ। তবে এই চুক্তির আগেই বন্দর রক্ষা আন্দোলনের ব্যানারে বর্তমান কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়।
আজকের অবস্থান কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বলেন, “৮ অক্টোবর ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি ইজারা দেওয়ার বিষয়ে চুক্তি হতে পারে বলে শোনা যাচ্ছে। যদি তা–ই হয়, তাহলে চুক্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর বন্ধ হয়ে যাবে।” তিনি এই আশঙ্কার কথা জানিয়ে সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
বন্দর রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব ফজলুল কবির প্রশ্ন তোলেন, সরকার যখন অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে, তখন এনসিটি ও সিসিটির মতো কৌশলগত অবকাঠামো দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দিতে কেন এত তাড়াহুড়া করছে, তা জনগণের কাছে ব্যাখ্যা করতে হবে।
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার অভিযোগ করে বলেন, বর্তমান বন্দর চেয়ারম্যান ডিপি ওয়ার্ল্ডের স্বার্থে কাজ করছেন। বন্দর ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তিনি বন্দর চেয়ারম্যানকে প্রত্যাহারের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
জাতীয়তাবাদী বন্দর শ্রমিক দলের নেতা হুমায়ুন কবীর তাঁর হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “আমরা আশা করেছিলাম সরকার এনসিটি ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ বন্ধ করবে। শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু আমরা হতাশ।”
অন্যদিকে, ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের (টিইউসি) সভাপতি তপন দত্ত ঘোষণা করেন যে, দাবি আদায়ে আগামী ১৩ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যানকে ঘেরাও করা হবে এবং তাঁকে কার্যালয় থেকে বের হতে দেওয়া হবে না।
ডক শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “বিদেশিদের ইজারা নিয়ে সরকার আমাদের বুঝিয়ে দেবে অন্যথায় আমরা নিজেরাই বুঝে নেব। এভাবে আমরা আর বসে থাকব না।”
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শ ম জামাল উদ্দিন তাঁর আশঙ্কার কথা জানিয়ে বলেন, বন্দরের পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশিদের হাতে দেওয়া হলে তারা নামমাত্র কর দিয়ে বড় অংশের অর্থ নিয়ে যেতে পারে। তিনি মনে করেন, দেশীয় জনবল দিয়ে বন্দর পরিচালনা করলে এর আয় দেশের অর্থনীতিতেই থাকবে।
এদিনের কর্মসূচিতে আরও বক্তব্য প্রদান করেন বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি এস কে খোদা তোতন, ডক শ্রমিক দলের সভাপতি মো. হারুন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি অশোক সাহা এবং বাসদ মার্ক্সবাদী চট্টগ্রাম জেলার সমন্বয়ক শফিউদ্দিন কবির আবিদ প্রমুখ।