বাংলাদেশে কয়েকটি কোম্পানিতে আত্মসাৎ করা অর্থ বিনিয়োগের অভিযোগের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট শেয়ার বাজেয়াপ্ত করার আপিল দ্রুত শুনানি ও নিষ্পত্তিতে সহযোগিতার অনুরোধ জানিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। বুধবার সকালে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে অবস্থিত অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে এসে বাংলাদেশের নিযুক্ত ইউএই রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ আলী আবদুল্লাহ আলহামুদি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজলের সঙ্গে এক সাক্ষাতে এই অনুরোধ জানান।
ঘটনার মূলে রয়েছেন ব্যবসায়ী খাতের মাসাদ, যিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রাস আল-খাইমাহ ইনভেস্টমেন্ট অথরিটির (আরএআইএ) সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৫ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি এই পদে কর্মরত ছিলেন। অভিযোগ উঠেছে যে, দায়িত্ব পালনকালে তিনি সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেন এবং সেই অর্থের একটি অংশ বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। রাষ্ট্রদূত খাতের মাসাদের বিনিয়োগ করা শেয়ার বাজেয়াপ্ত সংক্রান্ত আপিলটি দ্রুত শুনানির মাধ্যমে নিষ্পত্তির জন্য সহযোগিতার আবেদন জানান। অন্যদিকে, অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুসও ইউএইর কাছে পারস্পরিক আইনি সহায়তা কামনা করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আরও বেশি কর্মী নিয়োগের বিষয়টি উদার দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করার অনুরোধ জানান তিনি।
সাক্ষাৎকার শেষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে আমি রাষ্ট্রদূতকে বলেছি যে সরকারের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইউএইকে এবং আরএআইএকে সহযোগিতার জন্য আমাদের যে উদ্যোগ, তা অব্যাহত থাকবে এবং আরও গতিশীল হবে।’
নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ১৪ মে পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তির (এমএলএটি) আওতায় ইউএই কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ সরকারের কাছে সহায়তা চেয়ে আবেদন করে। তাদের অনুরোধ ছিল, বাংলাদেশে খাতের মাসাদের বিনিয়োগ করা শেয়ারগুলো বাজেয়াপ্ত করে ইউএইর মনোনীত প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হোক। এই অনুরোধের প্রেক্ষিতে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় আদালতের অনুমতি চেয়ে আবেদন করে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়। এর ফলে ২০২১ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকার একটি আদালত উক্ত শেয়ারগুলো বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ প্রদান করেন। তবে জন্মসূত্রে লেবানিজ খাতের মাসাদ এই আদেশের বিরুদ্ধে ২০২১ সালে হাইকোর্টে আপিল করেন। হাইকোর্ট ২০২১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি সেই আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় নথি তলব করেন।
সাক্ষাতে উপস্থিত ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ওসমান চৌধুরী জানান, মাসাদের করা আপিলটির শুনানি হয়েছে এবং হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ গত ৯ আগস্ট সেটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “নিম্ন আদালতের আদেশ অনুযায়ী বাংলাদেশের তিনটি কোম্পানিতে খাতের মাসাদের শেয়ার বাজেয়াপ্ত ও হস্তান্তরের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে ওই আপিল দ্রুত শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে অ্যাটর্নি জেনারেলকে অনুরোধ জানিয়েছেন ইউএই রাষ্ট্রদূত।”
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, ‘রাষ্ট্রটির খাতের মাসাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে, যখন রাস আল-খাইমাহ ইনভেস্টমেন্ট অথরিটির সিইও ছিলেন, তখন অপব্যবহার করে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। তিনি বাংলাদেশের তিনটি কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছেন। বাংলাদেশে স্টার সিরামিকস লিমিটেড, স্টার পরসেলিন লিমিটেড ও রাকিন ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড—এই তিনটি কোম্পানির মধ্যে রাকিন ডেভেলপমেন্টে খাতের মাসাদের নিজের নামে শেয়ার রয়েছে। বাকি দুটি তাঁর গড়া বিদেশি কোম্পানি, যে দুটি বাংলাদেশের দুটি কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছে। অর্থাৎ তিনটি কোম্পানিতে তাঁর বিনিয়োগ তথা শেয়ার রয়েছে। পাচার হয়ে যে অর্থ আমাদের দেশে আনা হয়েছে বলে দেশটির অভিযোগ, সে–সম্পর্কিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে সহযোগিতা এবং দ্রুত আপিল শুনানি ও নিষ্পত্তিতে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।’
আদালতে দাখিল করা নথির তথ্যমতে, খাতের মাসাদের স্টার সিরামিকসে ৬ কোটি ৫৩ লাখ ৩৩ হাজার শেয়ার, স্টার পরসেলিনে ২ কোটি ৩ লাখ ১২ হাজার ৫০০ শেয়ার এবং রাকিন ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডে ৪ কোটি ৪ লাখ ৭১ হাজার ৬৮০টি শেয়ার রয়েছে।