ময়মনসিংহের সুতিয়াখালী রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে এখন দাঁড়িয়ে থাকলে এক সময়ের সেই ব্যস্ততার চিহ্ন খুঁজে পাওয়া দায়। টিকিট কাউন্টারে যাত্রীদের দীর্ঘ সারি, প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষমাণ ভিড় কিংবা হকারদের উচ্চস্বরে হাঁকডাক—সবই এখন কেবল স্মৃতি। রেললাইন, স্টেশন এবং প্ল্যাটফর্ম সব ঠিক থাকলেও নেই শুধু নিয়মিত ট্রেনের চলাচল। প্রায় দুই দশক ধরে এভাবেই পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে এই স্টেশনটি।

সুতিয়াখালীই একমাত্র উদাহরণ নয়; ময়মনসিংহ ও সংলগ্ন জেলাগুলোর আরও অনেক রেলস্টেশনের চিত্রও প্রায় একই রকম। কোথাও এক দশক, কোথাও দুই দশক ধরে ট্রেন থামেনি। এমনকি যেসব রুটে স্টেশনগুলো এখনো চালু আছে, সেখানেও অনেক লোকাল ট্রেন বছরের পর বছর বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে রেলপথ থাকলেও সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এই সংকটের কারণ হিসেবে ইঞ্জিন ও জনবল স্বল্পতার কথা উল্লেখ করেছে। তবে প্রশ্ন উঠছে, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে একই সংকট বিদ্যমান থাকলেও কেন এর কোনো স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব হয়নি? পাশাপাশি বছরের পর বছর বন্ধ থাকা স্টেশনগুলোর অবকাঠামো ধ্বংস হওয়া এবং স্থানীয় অর্থনীতির যে ক্ষতি হচ্ছে, তার হিসাব রাখা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

রেলওয়ের তথ্যমতে, ২০২৪ সাল থেকে ময়মনসিংহ-মোহনগঞ্জ রুটে দুই জোড়া ট্রেন বন্ধ। ময়মনসিংহ-দেওয়ানগঞ্জ রুটের দুই জোড়া ট্রেনের মধ্যে এক জোড়া ২০২০ সাল থেকে এবং অন্য জোড়া ২০২৫ সাল থেকে বন্ধ। এছাড়া ময়মনসিংহ-ভৈরব রুটের দুই জোড়া ট্রেনও ২০২০ সাল থেকে চলাচল বন্ধ রেখেছে। একসময় যেসব রুটে স্বল্প খরচে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করতেন, এখন তাদের বড় অংশই সড়কপথের ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হচ্ছেন।

দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ রুটের ভাওয়াল এক্সপ্রেস এবং ভূঞাপুর-ময়মনসিংহ রুটের ধলেশ্বরী এক্সপ্রেসসহ বেশ কিছু মেইল ট্রেন। ঢাকা থেকে ভৈরব হয়ে ময়মনসিংহগামী ইশা খাঁ এক্সপ্রেস প্রায় এক দশক ধরে বন্ধ। এই রুটে আরও দুই জোড়া লোকাল ট্রেন প্রায় পাঁচ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। সম্প্রতি ২৪ আগস্ট থেকে ময়মনসিংহ মেইলের চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভূঞাপুর থেকে ময়মনসিংহ হয়ে চট্টগ্রামগামী যাত্রীরা চরম সংকটে পড়েছেন এবং বিকল্প পরিবহনের ওপর নির্ভর করছেন।

ময়মনসিংহ অঞ্চলের স্টেশনগুলোর তালিকা দেখলে সমস্যার গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়। ময়মনসিংহ সদরের বাইগনবাড়ী, গৌরীপুরের বিসকা, ঈশ্বরগঞ্জের ঈশ্বরগঞ্জ ও সোহাগী, নান্দাইলের নান্দাইল, নেত্রকোনা সদরের ঠাকুরকোনা, জামালপুরের বাউসী, শহীদ নগর/বারইপটল ও কোর্ট, মেলান্দহের দুরমুঠ, ইসলামপুরের মোশারফগঞ্জ, টাঙ্গাইলের গোপালপুরের হেমনগর, ভৈরবের কালিকাপ্রসাদ এবং কিশোরগঞ্জ সদরের নীলগঞ্জ স্টেশন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ বা অচল।

এর মধ্যে ময়মনসিংহ সদরের সুতিয়াখালী, ত্রিশালের ধলা, গাজীপুরের শ্রীপুরের সাতখামাইর ও ইজ্জতপুর স্টেশন প্রায় দুই যুগ ধরে বন্ধ। গৌরীপুরের বিসকা, ঈশ্বরগঞ্জের সোহাগী এবং নান্দাইল স্টেশন বন্ধ প্রায় এক দশক ধরে। কিশোরগঞ্জের নীলগঞ্জ এবং ভৈরবের কালিকাপ্রসাদ স্টেশনও দীর্ঘ এক থেকে দুই দশক ধরে অচল হয়ে পড়ে আছে।

ঈশ্বরগঞ্জের সোহাগী এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন রেলে যাতায়াতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তিনি বলেন, “আগে ট্রেনে যাতায়াত করলে ভাড়া কম লাগত, সময়ও মোটামুটি নির্ধারিত থাকত। এখন বাসে যেতে হয়। ভাড়া বেশি, যানজটের ঝুঁকি আছে, আবার পথে গাড়ি পরিবর্তনের প্রয়োজনও পড়ে। আমার মতো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের যাত্রীদের জন্য রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার অর্থ শুধু একটি পরিবহনব্যবস্থা হারানো নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বাড়তি ব্যয়।”

নান্দাইলের কৃষক আব্দুল জলিল স্থানীয় বাজারে কৃষিপণ্য নিয়ে যাতায়াত করেন। তার ভাষ্য, আগে রেলপথে পণ্য পাঠানোর সুযোগ থাকায় খরচ কম ছিল। এখন ভ্যান বা ট্রাকে পণ্য পাঠাতে হয়। জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বাড়ায় পণ্যের দামেও তার প্রভাব পড়ছে।

ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশনে আনন্দ মোহন কলেজের শিক্ষার্থী সাদিক হাসান জানান, একটি ট্রেন বন্ধ হলে শুধু একজন যাত্রী সমস্যায় পড়েন না। একই রুটে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ যাতায়াত করেন। তাদের প্রত্যেকের বাড়তি ভাড়া ও সময়ের অপচয় মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ অনেক বড়।

বিসকা রেলস্টেশনে একসময় চা বিক্রি করা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আদিল মিয়া বলেন, “আগে ট্রেন আসার সময় দোকানে ভিড় থাকত। যাত্রীরা চা, পানি, খাবার কিনতেন। এখন ট্রেন নেই, যাত্রীও নেই। ফলে ভ্রাম্যমাণ চা বিক্রি করছি। তবে আগের মতো টাকা রোজগার হয় না। সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।”

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা স্টেশনগুলোর অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক জায়গায় স্টেশন ভবন ও স্থাপনা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং রেলওয়ের সম্পদ চুরি হচ্ছে। কিছু নাগরিক মনে করেন, সড়ক পরিবহন খাতের ব্যবসায়িক স্বার্থের কারণে রেল যোগাযোগ সচল করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। ট্রেন বন্ধ হলে যাত্রীরা বাধ্য হয়ে সড়কপথে যান, যার ফলে বাস ও অন্যান্য যানবাহনের আয় বৃদ্ধি পায়।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ময়মনসিংহ মহানগরের সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, “লোকাল ট্রেনকে আমরা মূলত গরিবের ট্রেন বলি। কারণ, নিম্নআয়ের মানুষ, শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষই এসব ট্রেনে সবচেয়ে বেশি যাতায়াত করেন। অথচ অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে, দীর্ঘদিন ধরে ধীরে ধীরে ময়মনসিংহ অঞ্চলের একের পর এক লোকাল ট্রেন বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষ। লোকাল ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মানুষের সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য যাতায়াতের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। বাধ্য হয়ে অনেক মানুষ সড়কপথে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে চলাচল করছেন। এতে সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যাও বেড়ছে। অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ ও সড়কে বিশৃঙ্খলার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।”

তিনি আরও বলেন, “আমাদের আশঙ্কা, লোকাল ট্রেনগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে পরিবহন খাতের কোনো অসাধু সিন্ডিকেটের প্রভাব রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। রেলওয়ের কোনো কোনো কর্মকর্তা এর সঙ্গে যুক্ত কি না, সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করে আনা দরকার। আমরা কাউকে আগাম দায়ী করছি না; তবে বিষয়টি যথাযথভাবে তদন্ত হওয়া জরুরি। এর পেছনে কারও অনিয়ম, স্বার্থসংশ্লিষ্টতা বা অশুভ তৎপরতা রয়েছে কি না তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক। সাশ্রয়ী ও নিরাপদ গণপরিবহনের স্বার্থে লোকাল ট্রেন চালু করা হোক।”

ময়মনসিংহ নাগরিক আন্দোলনের সভাপতি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ.এইচ.এম খালেকুজ্জামান বলেন, “ট্রেন বন্ধ শুধু একটি যাত্রার সংকট নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, স্থানীয় বাজার আর পণ্য পরিবহনের অর্থনীতি। তাই মানুষের দাবি, ইঞ্জিন সংকটের দ্রুত সমাধান করে ময়মনসিংহ অঞ্চলে বন্ধ থাকা ট্রেন ও স্টেশনগুলো আবার চালু করা হোক। তাহলেই কমবে যাতায়াতের খরচ, গতি ফিরবে পণ্য পরিবহনে, আর প্রাণ ফিরবে রেলস্টেশনকেন্দ্রিক স্থানীয় অর্থনীতিতে।”

ময়মনসিংহ রেলওয়ে জংশনের স্টেশন সুপার আব্দুল্লাহ আল হারুন জানান, জারিয়া লোকাল ট্রেন চালু থাকলেও তা অনিয়মিত। ইঞ্জিন সংকটের কারণে বাকি সব লোকাল ট্রেন বন্ধ। ইঞ্জিন পাওয়া গেলে ট্রেনগুলো পুনরায় চালু করা হবে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইঞ্জিন ও জনবল সংকটের কারণে স্টেশনগুলো অচল হয়ে আছে, তবে ইঞ্জিন পেলে স্টেশনগুলোও সচল করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে, ময়মনসিংহের সিনিয়র সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাজমুল হাসান বলেন, “লোকাল ট্রেন চালুর উদ্যোগ ইতোমধ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। ইঞ্জিন কেনার জন্য রেলওয়ের মেকানিকাল বিভাগ ইতোমধ্যে টেন্ডারিং প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছে। ইঞ্জিনের পাশাপাশি বগি কেনার জন্যও টেন্ডার করা হচ্ছে। টেন্ডারিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ইঞ্জিন ও বগি পাওয়া গেলে বন্ধ থাকা লোকাল ট্রেনগুলো পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে।”

তিনি আরও জানান, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা স্টেশনগুলো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলে রেললাইন সচল করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রেলওয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মাধ্যমে মেরামতকাজ সম্পন্ন করে লাইনগুলো ট্রেন চলাচলের উপযোগী করা হবে।