বান্দরবান-থানচি সড়কে টানা তিন দিন ধরে যাত্রীবাহী বাসের চাকা বন্ধ থাকার পর এবার জিপ (চাঁদের গাড়ি) ও মাহেন্দ্র চালকরাও তাদের যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন। পরিবহন খাতের এই অচলাবস্থায় বান্দরবান জেলা সদর ও থানচি উপজেলা সদরের মধ্যে নিয়মিত যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষ চরম সংকটে পড়েছেন। বিশেষ করে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ, ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা এবং সরকারি-বেসরকারি দপ্তরে জরুরি কাজে যাতায়াত করতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা চরম বিপাকে পড়েছেন।
গত শনিবার (১০ অক্টোবর) জিপ ও মাহেন্দ্র চালক সমিতির নেতারা স্থানীয় যাত্রী পরিবহন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এর আগে ওই সড়কে টানা তিন দিন ধরে বাস চলাচল বন্ধ থাকায় যাত্রীদের দুর্ভোগ শুরু হয়েছিল। বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত জিপ ও মাহেন্দ্রর চলাচলও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি এখন আরও জটিল রূপ নিয়েছে।
চালক সমিতির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পর্যটকেরা দলবদ্ধভাবে গাড়ি ভাড়া বা রিজার্ভ করে যাতায়াত করতে পারবেন। তবে পথে পথে স্থানীয় বাসিন্দাদের লোকাল যাত্রী হিসেবে গাড়িতে তোলা যাবে না। ফলে বান্দরবান সদর থেকে থানচি কিংবা থানচি থেকে জেলা সদরে নিয়মিত যাতায়াতের জন্য যেসব মানুষ এসব যানবাহনের ওপর নির্ভরশীল, তাদের দুর্ভোগ বহুগুণ বেড়েছে।
থানচি জিপচালক সমিতির সভাপতি মংসিংহ্লা মারমা ও সাধারণ সম্পাদক লোকমান এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। জিপচালক সমিতির লাইনম্যান মো. কামাল জানান, পর্যটকেরা দলবদ্ধভাবে গাড়ি রিজার্ভ করে যাতায়াত করতে পারবেন, এতে কোনো বাধা নেই। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের লোকাল যাত্রী হিসেবে গাড়িতে তোলা যাবে না।
অন্যদিকে, বান্দরবান-থানচি সড়কে বাস চলাচল বন্ধের বিষয়ে বাসচালক সমিতির সভাপতি মো. খালেদ অভিযোগ করে বলেন, “সড়কে একটি পক্ষ তাদের কাছে অতিরিক্ত চাঁদা দাবি করছে। এ কারণে তারা বাস চলাচল বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী দাবি করা হলে আমরা দিতে পারতাম। কিন্তু অতিরিক্ত টাকা দাবি করায় আমরা অপারগতা প্রকাশ করেছি।”
একই সুরে কথা বলেছেন বাসচালক জহির উদ্দিন। তিনি অতিরিক্ত অর্থ দাবির বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে বলেন, “জ্বালানি তেলের দাম বেশি হওয়ায় বাসের আয় থেকে বাড়তি টাকা দেওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। আমাদের সামর্থ্যের বাইরে অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হলে তা দেওয়া সম্ভব নয়। আমাদের অবস্থাটাও বিবেচনা করতে হবে। সামর্থ্যের মধ্যে দাবি করা হলে আমরা দিতে পারতাম।”
বাস, জিপ ও মাহেন্দ্রর চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বান্দরবান সদর ও থানচির মধ্যে যোগাযোগব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এর ফলে চিকিৎসার জন্য জেলা সদরে আসা রোগী, ব্যবসায়িক প্রয়োজনে পণ্য আনা-নেওয়া করা ব্যবসায়ী এবং শিক্ষা ও দাপ্তরিক কাজে যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য এই সড়কটি কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং এটি তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান সংযোগপথ। পর্যটকেরা দলবদ্ধভাবে গাড়ি রিজার্ভ করে চলাচলের সুযোগ পেলেও সাধারণ যাত্রীরা সেই সুবিধা পাচ্ছেন না। ফলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সীমিত আয়ের মানুষ এবং জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াত করতে ইচ্ছুক যাত্রীরা।
সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এই পরিবহন সংকট দীর্ঘায়িত হলে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, পণ্য পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বান্দরবান, রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচি বাস মালিক সমিতির সভাপতি আবদুল শুকুরের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে অতিরিক্ত চাঁদা দাবির অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত পক্ষের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।