দক্ষিণ কোরিয়ার পুরুষ ক্রীড়াবিদদের জন্য অলিম্পিকে পদক জয় কিংবা এশিয়ান গেমসে স্বর্ণপদক অর্জনের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্ব থেকে বিশেষ ছাড় পাওয়ার দীর্ঘদিনের প্রচলিত ব্যবস্থাটি সীমিত বা পরিবর্তন করার কথা ভাবছে দেশটির সরকার। বহু বছর ধরে চালু থাকা এই বিশেষ সুবিধার পরিধি ছোট করার পরিকল্পনা এখন সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।

সম্প্রতি সমাপ্ত আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসে ফুটবল দলের স্বর্ণজয়নের পর বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়ের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এই বিতর্কের প্রেক্ষাপটেই বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে এবং সরকারের নজর কাড়ে।

বুধবার দেশটির জাতীয় পরিষদের সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও পর্যটনবিষয়ক কমিটির এক বৈঠকে ক্রীড়ামন্ত্রী চে হুই-ইয়ং জানান, বর্তমান ব্যবস্থাটি সামগ্রিকভাবে নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বৈঠকে তিনি বলেন, ‘এটি সত্য যে এই ব্যবস্থা মেধাবী শিল্পী ও ক্রীড়াবিদদের নিজেদের সামর্থ্য ধরে রাখতে এবং আরও বিকশিত করতে সাহায্য করেছে। তবে সামরিক দায়িত্ব নিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি এবং ন্যায্যতার ধারণা সময়ের সঙ্গে অনেকটাই বদলেছে।’

মন্ত্রী আরও জানান, নতুন কোনো ব্যবস্থা প্রণয়নের ক্ষেত্রে তিনি ক্রীড়া ও শিল্প অঙ্গনের প্রতিনিধিদের মতামতের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সামরিক জনশক্তি প্রশাসনের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করবেন।

এর ঠিক একদিন আগে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছিল। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শিল্পী ও ক্রীড়াবিদদের জন্য বিদ্যমান বিশেষ সামরিক ব্যবস্থাটি কমানো অথবা পুরোপুরি বাতিল করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে প্রধানত সামাজিক ন্যায্যতা, সামরিক দায়িত্ব পালনের উপযোগী জনসংখ্যার হ্রাস এবং পরিবর্তিত জনমতের মতো বিষয়গুলো প্রভাব ফেলছে বলে উল্লেখ করা হয়।

সাধারণত দক্ষিণ কোরিয়ার সক্ষম পুরুষদের ১৮ থেকে ২১ মাস পর্যন্ত বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। তবে অলিম্পিকে পদক জয়ী বা এশিয়ান গেমসে স্বর্ণপদক জয়ী ক্রীড়াবিদরা একটি বিশেষ বিশেষ সুবিধার আওতায় আসেন। যদিও একে সরাসরি সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি বলা হয়, তবে বাস্তবে তাদের তিন সপ্তাহের একটি মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে হয়। সেই সঙ্গে ৩৪ মাসের মধ্যে মোট ৫৪৪ ঘণ্টা সামাজিক সেবামূলক কাজ সম্পন্ন করতে হয়।

চলতি এশিয়ান গেমসে জাপানকে ১-০ গোলে পরাজিত করে পুরুষ ফুটবলে টানা চতুর্থবারের মতো স্বর্ণপদক জিতেছে দক্ষিণ কোরিয়া। ওই দলের ২৩ জন ফুটবলারের মধ্যে ২০ জনই এই বিশেষ সামরিক সুবিধার যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন।

তবে স্বর্ণজয়নের পর কয়েকজন খেলোয়াড়ের বিতর্কিত মন্তব্যে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়। টটেনহাম হটস্পারের ইয়াং মিন-হিয়ক মন্তব্য করেন যে, তাঁর কাছে পদক বা শিরোপার চেয়ে সামরিক ছাড় পাওয়াই ছিল মূল লক্ষ্য। দলের অধিনায়ক লি গি-হিয়কও ম্যাচের পর সামরিক দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছেন বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। অন্যদিকে, পার্ক সেউং-সু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একটি টুপি পরে ছবি পোস্ট করেন, যা সাধারণত সামরিক দায়িত্ব শেষ করা ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কিত। পরবর্তীতে এই তিন খেলোয়াড়ই তাঁদের আচরণের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন।

জাতীয় পরিষদের আলোচনায় উঠে এসেছে যে, এবারের এশিয়ান গেমসে কেবল ফুটবল নয়, আরও অনেক ক্রীড়াবিদ এই সুবিধা পেয়েছেন। মোট ৪৩ জন যোগ্য ক্রীড়াবিদের মধ্যে ৩৬ জনই ফুটবল অথবা বেসবল দলের সদস্য ছিলেন।

এই ব্যাপক বিতর্কের পর এখন সরকারের সামনে মূল প্রশ্নটি হলো—আন্তর্জাতিক সাফল্যের পুরস্কার হিসেবে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই বিশেষ সুবিধাটি কি আগের মতোই বহাল থাকবে, নাকি সামরিক দায়িত্ব পালনের ন্যায্যতার প্রশ্নে এর পরিধি সংকুচিত করা হবে।