দ্বিতীয়বারের মতো এশিয়ান গেমস ফুটবলে অংশ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ নারী দল। গ্রুপ পর্বে তাদের মুখোমুখি হতে হবে উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও মিয়ানমারের বিপক্ষে। আগামীকাল প্রথম ম্যাচে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে মাঠে নামার আগে জাপান থেকে মোবাইল ফোনে দলের সম্ভাবনা, প্রস্তুতি এবং সীমাবদ্ধতা নিয়ে কথা বলেছেন প্রধান কোচ পিটার বাটলার। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জহির উদ্দিন।

এশিয়ান গেমস থেকে কী প্রত্যাশা করছেন?
পিটার বাটলার বলেন, "আমাদের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ভালো পারফরম্যান্স দিয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করা। আমরা এখনো এশিয়ান পর্যায়ে যেতে পারিনি। তাই কোনো অবাস্তব লক্ষ্য ঠিক করতে চাই না। নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে চাই এবং দেখাতে চাই, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ কতটা এগিয়েছে। লড়াইয়ের মানসিকতাই আমাদের শক্তি।"

২০২২ সালের এশিয়ান গেমসে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় বাংলাদেশ নারী দল। এবারের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তিনি বলেন, "এবার চ্যালেঞ্জ অবশ্যই আরও বেশি। আমাদের সামনে এশিয়ার শক্তিশালী দুই কোরিয়া আছে, যাদের দলে অনেক মানসম্পন্ন খেলোয়াড়। তাদের বিপক্ষে ভালো ফল করা বেশ কঠিন। অনেকের কাছে অসম্ভবও মনে হতে পারে। তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। আমাদের কাজ হলো মাঠে সর্বোচ্চটা দেওয়া এবং নিজেদের উন্নতির জায়গাগুলো দেখানো।"

বাংলাদেশ নারী দল সাফ কাপে দুবার চ্যাম্পিয়ন হলেও এশিয়ান পর্যায়ে তার বিপরীত ছবি দেখা যায়। এর কারণ জানতে চাইলে বাটলার বলেন, "সাফ এবং এশিয়ার শীর্ষ পর্যায় সম্পূর্ণ আলাদা। আপনি দুটিকে তুলনা করতে পারবেন না। তবে বাংলাদেশ যে এগোচ্ছে, সেটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আমরা সিনিয়র ও অনূর্ধ্ব-২০; দুই পর্যায়েই এশিয়ান কাপে জায়গা করে নিয়েছি। এটা বাংলাদেশের নারী ফুটবলের জন্য বড় অর্জন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমি মেয়েদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে পেরেছি। তারা এখন বিশ্বাস করে, তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে।"

অস্ট্রেলিয়ায় প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপ খেলা অভিজ্ঞতার বিষয়ে তিনি বলেন, "আমি অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে শুধু ফলাফলের দিকে তাকাইনি। আমি চেয়েছিলাম, মেয়েরা নিজেদের পারফরম্যান্স দিয়ে গর্ব করার মতো কিছু করুক। তারা সেটাই করেছে। এত বড় মঞ্চে প্রথমবার খেলা সহজ ছিল না। সেই অভিজ্ঞতা তাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে।"

এশিয়ান গেমসের আগে চীনে ১০ দিনের ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়। কোরিয়া ও মিয়ানমারের মতো দলের বিপক্ষে লড়াইয়ের প্রস্তুতি কেমন হয়েছে? এই প্রশ্নের জবাবে বাটলার বলেন, "১০ দিন অবশ্যই যথেষ্ট নয়। ক্যাম্পটি ভালো হয়েছে এবং এ জন্য সভাপতি তাবিথ আউয়ালকে ধন্যবাদ দিতে হয়। তিনি আমাদের অনেক সহযোগিতা করেছেন। তবে আমাদের পুরো নারী ফুটবল–ব্যবস্থাটাকেই আরও গোছাতে হবে। পর্যাপ্ত আবাসন, প্রশিক্ষণসুবিধা এবং নিয়মিত প্রস্তুতির সুযোগ দরকার।"

দুই কোরিয়ার বিপক্ষে কৌশল সম্পর্কে তিনি জানান, "দুই কোরিয়ার বিপক্ষে একইভাবে খেলতে পারব না। এমনভাবে খেলতে চাই, যাতে তাদের খেলার জায়গা কমিয়ে দেওয়া যায় এবং আমাদের দলকে সংগঠিত রাখা যায়। তাদের খেলোয়াড়েরা অনেক ভালো মানের, অনেকেই বিদেশি লিগে খেলে। আমাদের সেই মানের খেলোয়াড় বা সুযোগ-সুবিধা নেই। তাই আমাদের হাতে যে খেলোয়াড় ও যে সামর্থ্য আছে, সেটার ওপর ভিত্তি করেই পরিকল্পনা করতে হবে।"

মিয়ানমারকে সহজ প্রতিপক্ষ মনে করেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, "কোনো দলকেই আলাদা করে দেখছি না। উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা মিয়ানমার—সব দলকেই সমান সম্মান করি।"

বাংলাদেশের নারীরা এশিয়ার বড় দলের বিপক্ষে খেলার সুযোগ কম পান। এই ঘাটতি দূর করার উপায় সম্পর্কে বাটলার বলেন, "শক্তিশালী দলের বিপক্ষে খেললে অভিজ্ঞতা হয়, কিন্তু ফলাফল নিয়ে অনেক সময় অতিরিক্ত চাপও তৈরি হয়। বাংলাদেশ খেলাপ্রেমী দেশ, এখানে ক্রিকেটের প্রতি মানুষের আবেগ অনেক বেশি। ফুটবলেও আবেগ আছে। কিন্তু আমাদের ফলাফলের চেয়ে পারফরম্যান্সকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। ক্রিকেটও এমন সময়ের মধ্য দিয়ে গেছে। এখন তারা অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে। কারণ, অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা অনেক উন্নত হয়েছে। নারী ফুটবলেও আমাদের সেই পথে এগোতে হবে।"

এশিয়ান গেমসে ফলাফল নাকি পারফরম্যান্স, কোনটি গুরুত্বপূর্ণ? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, "প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা আর জেতা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। আমাদের এখনো শক্তিশালী ঘরোয়া লিগ নেই, বিদেশি লিগে খেলা খেলোয়াড়ও খুব কম। ঋতুপর্ণা ছাড়া কোনো খেলোয়াড় নিয়মিত বিদেশি লিগে খেলছে না। কোরিয়া বা জাপানের পর্যায়ে যেতে আমাদের হয়তো ৫০ বছরও লাগতে পারে, হয়তো আরও বেশি। তার মানে এই নয় যে আমরা স্বপ্ন দেখব না। আমাদের আশা আছে, তবে পথটা কঠিন। আসলে একটা পর্যায়ে গিয়ে আমাদের বাস্তবতা মেনে নিতেই হয়। তখনই মেয়েরা সুযোগ-সুবিধা, আর্থিক সহায়তা এবং সমর্থনের প্রয়োজনীয়তাটা অনুভব করে।"

আড়াই বছর ধরে বাংলাদেশ নারী দলের কোচ হিসেবে কাজ করছেন পিটার বাটলার। এই সময়ে দল কতটা এগিয়েছে? তিনি বলেন, "অর্জনগুলো দেখলেই উন্নতিটা বোঝা যায়। দুবার সাফের ফাইনালে ওঠা, একবার চ্যাম্পিয়ন হওয়া, অনূর্ধ্ব-২০ সাফের ফাইনালে খেলা, সিনিয়র ও অনূর্ধ্ব-২০ দুই দলকেই এশিয়ান কাপে নিয়ে যাওয়া—এসবই এগিয়ে যাওয়ার মাপকাঠি। তবে এই সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হয়েছে খেলার ধরনে। আগে আমরা বল সামনে পাঠিয়ে দৌড়ানোর ফুটবল খেলতাম। এখন মেয়েরা পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলা বদলাতে পারে।"