হলিউডের স্বর্ণযুগের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং স্মরণীয় অভিনেত্রী ইভা মেরি সেইন্ট আর নেই। ‘অন দ্য ওয়াটারফ্রন্ট’ এবং ‘নর্থ বাই নর্থওয়েস্ট’-এর মতো কালজয়ী চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাওয়া এই অস্কারজয়ী তারকার বয়স হয়েছিল ১০২ বছর।
গত মঙ্গলবার লস অ্যাঞ্জেলেসে নিজের বাসভবনে থাকাকালীন তাঁর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। তাঁর প্রতিনিধি জেফ স্যান্ডারসন জানিয়েছেন, মৃত্যুর মুহূর্তে পরিবারের সদস্যরা তাঁর পাশে ছিলেন।
সাত দশকেরও বেশি দীর্ঘ অভিনয় জীবনে ইভা মেরি সেইন্ট কাজ করেছেন বিশ্ববিখ্যাত সব পরিচালকের সঙ্গে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন এলিয়া কাজান, আলফ্রেড হিচকক, অটো প্রিমিঙ্গার এবং জন ফ্রাঙ্কেনহাইমার। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি মার্লন ব্র্যান্ডো, ক্যারি গ্রান্ট, পল নিউম্যান ও ওয়ারেন বিটির মতো কিংবদন্তি তারকার বিপরীতে পর্দায় অভিনয় করেছেন। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি টেলিভিশন জগতেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সফল এবং এই কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি এমি পুরস্কারও লাভ করেন।
১৯৫৪ সালে এলিয়া কাজানের পরিচালিত ‘অন দ্য ওয়াটারফ্রন্ট’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি বড় পর্দায় অভিষেক করেন। এই ছবিতে মার্লন ব্র্যান্ডোর বিপরীতে এডি ডয়েল চরিত্রে অভিনয় করে প্রথম ছবিতেই সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রীর অস্কার জিতে নেন তিনি। ব্র্যান্ডোর তীব্র ও শক্তিশালী অভিনয়ের বিপরীতে সেইন্টের সংযত ও পরিমিত অভিনয় ছবিটিকে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছিল।
পরবর্তীতে ‘অন দ্য ওয়াটারফ্রন্ট’ চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ছবি হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তবে অস্কার জয়ের মাত্র দুই দিন পরেই মা হন ইভা মেরি সেইন্ট; জন্ম হয় তাঁর প্রথম সন্তান ড্যারেলের। ব্যক্তিগত জীবনকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার এই প্রবণতা তাঁর পরবর্তী ক্যারিয়ারের পথচলায় স্পষ্টভাবে দেখা গেছে।
১৯৫৯ সালে আলফ্রেড হিচককের ‘নর্থ বাই নর্থওয়েস্ট’ ছবিতে ক্যারি গ্রান্টের বিপরীতে অভিনয় করে তিনি আবারও ব্যাপক আলোচনায় আসেন। রহস্যময় ইভ কেন্ডাল চরিত্রে তাঁর অনবদ্য অভিনয় আজও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে অত্যন্ত স্মরণীয়।
হিচকক তাঁর পোশাক, চুল, মেকআপ থেকে শুরু করে আনুষঙ্গিক প্রতিটি বিষয় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নির্ধারণ করেছিলেন। এই বিষয়ে সেইন্ট পরে বলেছিলেন, পরিচালকের তৈরি বাহ্যিক অবয়বই তাঁকে চরিত্রটির ভেতরে ঢুকতে সাহায্য করেছিল।
এরপর তিনি ‘এক্সোডাস’ ছবিতে পল নিউম্যান এবং ‘অল ফল ডাউন’ ছবিতে ওয়ারেন বিটির সঙ্গে অভিনয় করেন। তবে হলিউডের শীর্ষস্থানে অবস্থান করেও তিনি নিয়মিত কাজ করার পথ বেছে নেননি। স্বামী জেফ্রি হেইডেন ও দুই সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার লক্ষ্যে তিনি অনেক আকর্ষণীয় কাজের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। হেইডেনের সঙ্গে তাঁর দাম্পত্য জীবন স্থায়ী ছিল দীর্ঘ ৬৫ বছর, যা ২০১৬ সালে স্বামীর মৃত্যু পর্যন্ত চলেছিল।
টেলিভিশন জগতেও সেইন্টের ক্যারিয়ার ছিল দীর্ঘ এবং সফল। ১৯৯০ সালে ‘পিপল লাইক আস’ নামক মিনি সিরিজে অসাধারণ অভিনয়ের জন্য তিনি এমি পুরস্কার জয় করেন।
দীর্ঘ বিরতির পর ২০০৬ সালে ‘সুপারম্যান রিটার্নস’ ছবিতে সুপারম্যানের দত্তক মা মার্থা কেন্ট চরিত্রে অভিনয় করে তিনি পুনরায় বড় পর্দায় ফিরে আসেন। আশির কোঠায় পৌঁছেও তিনি অভিনয় চালিয়ে যান। পরবর্তীতে ‘উইন্টার্স টেল’সহ আরও কয়েকটি চলচ্চিত্রে তাঁকে দেখা গেছে। এমনকি ২০১৮ সালের অস্কার অনুষ্ঠানেও পুরস্কার উপস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
১৯২৪ সালে নিউ জার্সির নিউয়ার্কে জন্ম নেওয়া ইভা মেরি সেইন্ট শুরুতে শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহী ছিলেন। তবে পরবর্তীতে নাটকের প্রতি প্রবল আগ্রহ থেকে তিনি অভিনয়কে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। সাত দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অস্কার ও এমি—উভয় সম্মানজনক পুরস্কারই জয় করা এই অভিনেত্রী হয়ে থাকবেন হলিউডের এক পরিবর্তনশীল যুগের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী।