ঝিনাইদহের মিশন আচার্যের ভাড়া বাসায় গিয়ে তার মায়ের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগপত্র তুলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর সহকারী (রাজনৈতিক) সচিব পদমর্যাদার মো. রাশেদ খাঁন। বুধবার (৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কলাবাগান এলাকায় এই আয়োজন করা হয়। এর একদিন আগে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কাজে যোগ দিয়েছিলেন মিশন আচার্য।

উল্লেখ্য যে, মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আমজাদ হোসেনের কাছ থেকে নিয়োগপত্র গ্রহণ করে উপজেলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেন মিশন আচার্য। তবে বুধবার তার মায়ের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগপত্র তুলে দেওয়ার মাধ্যমে সেই আনন্দ ভাগাভাগি করেন রাশেদ খানসহ স্থানীয় নেতা ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তারা।

নিয়োগপত্রটি মিশনের মায়ের হাতে তুলে দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সহকারী (রাজনৈতিক) সচিব পদমর্যাদার মো. রাশেদ খাঁন বলেন, “আপনাকে স্যালুট জানাই। শত কষ্ট সহ্য করেও তিনি হাল ছেড়ে দেননি। চাইলে সংসার চালানোর জন্য ছেলেকে ভ্যান বা অটোরিকশা কিনে দিতে পারতেন। কিন্তু তা না করে মানুষের বাড়িতে কাজ করে সামান্য আয় দিয়ে ছেলেকে বই কিনে দিয়েছেন, লেখাপড়া শিখিয়েছেন, আবার তার মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন।”

তিনি আরও বলেন, “ময়না আচার্য অনেক কষ্ট করে সন্তানকে মানুষ করেছেন। ছেলেকে বড় করতে গিয়ে তাকে মানুষের বাড়িতে কাজ করতে হয়েছে। তাদের জমিজমা নেই, ভাড়া বাসায় থাকেন। সেই বাসাটিও জরাজীর্ণ ও বসবাসের অনুপযোগী। আমি মনে করি, এই মা ভবিষ্যতে জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। আমি আশা করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকেই তিনি পুরস্কার গ্রহণ করবেন। এই মায়ের অবদান কোনো শব্দ বা বাক্য দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়।”

মিশনের চাকরির বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরার জন্য স্থানীয় সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানিয়ে রাশেদ খাঁন বলেন, ঝিনাইদহের সাংবাদিকরা বিষয়টি প্রকাশের মাধ্যমে তারসহ সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টিগোচরে এনেছেন। আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানও বিষয়টি জানার পর নিজ জায়গা থেকে সহযোগিতা করেছেন এবং মিশনের বাড়িতে এসে পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন বলে জানান তিনি।

রাশেদ খান আরও উল্লেখ করেন যে, জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ, উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট কামাল আজাদ পানু, সাধারণ সম্পাদক জাহিদুজ্জামান মনা, স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, মিশনের শিক্ষক ও উপজেলা শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তারাও চাকরির বিষয়টি সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

নিজের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “আমি সাধারণত কাউকে নিয়ে কোনো দপ্তরে যাই না। কিন্তু মিশনের বিষয়টি ব্যতিক্রম। আমি তাকে সঙ্গে নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর দপ্তরে গিয়েছি, ডিও লেটার দিয়েছি এবং চাকরির বিষয়ে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি। আমি বলেছিলাম, রবিবারের মধ্যেই সমাধান হবে, মিশন চাকরি পাবে এবং শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। আল্লাহর রহমতে আমরা সফল হয়েছি।”

শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে রাশেদ খান বলেন, “মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী বিষয়টি আন্তরিকতার সঙ্গে নিয়েছেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে তাদের প্রত্যাশা পূরণ করেছেন। তিনি তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ফোন করে বলেছিলেন, একজনের ভিটেবাড়ি নেই, এজন্য তার চাকরি হবে না? কোন সংবিধানে লেখা আছে?”

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নিয়োগপত্র হাতে পেয়ে মিশন আচার্য বলেন, “দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার পর সরকারি শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় আমি ও আমার পরিবার আনন্দিত।”

মেধা ও যোগ্যতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও শুধু ঠিকানা-সংক্রান্ত জটিলতায় যে নিয়োগ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল, আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্র হাতে পাওয়ার মধ্য দিয়ে অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান হলো মিশন আচার্য ও তার পরিবারের।

প্রসঙ্গত, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষাসহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের সব ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করেছিলেন মিশন আচার্য। কিন্তু ঠিকানা-সংক্রান্ত জটিলতায় তার নিয়োগ আটকে যায়। বিষয়টি জানাজানি হলে বিভিন্ন পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী (রাজনৈতিক) রাশেদ খাঁন শিক্ষামন্ত্রীর কাছে ডিও লেটার দেন এবং মিশনকে সঙ্গে নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর দপ্তরে গিয়ে বিষয়টি তুলে ধরেন।

গত সোমবার (৫ অক্টোবর) ঝিনাইদহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে মিশন আচার্যের নামে আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্র জারি করা হয়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরাধীন রাজস্বখাতভুক্ত সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা-২০২৫-এর ফলাফলের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ কমিটির সুপারিশে তাকে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ অনুযায়ী গ্রেড-১৩-এ ২৪ হাজার থেকে ৫৮ হাজার টাকা বেতনক্রমে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ৭ অক্টোবরের মধ্যে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে যোগদানের নির্দেশও দেওয়া হয়।