রাজধানীর তাঁতীবাজারের ব্যস্ত সড়কে বিকেল ৫টা ৫৮ মিনিটে হঠাৎ থেমে যায় নীল রঙের একটি প্রিজন ভ্যান। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, গাড়িটি থামার পর তার পেছনের দরজা খুলে দেওয়া হয়। এরপর ধীরে চলতে থাকা সেই গাড়ি থেকে মাস্ক পরিহিত তিন ব্যক্তি একে একে রাস্তায় নামেন। তাঁদের মধ্যে দুজন ছিলেন আসামি এবং অন্যজন একজন পুলিশ কর্মকর্তা।

মোহাম্মদপুরের আলোচিত মাদক কারবারি রাজা ওরফে পিচ্চি রাজার পালিয়ে যাওয়ার এই পুরো ঘটনাটি একাধিক সিসিটিভি ক্যামেরায় রেকর্ড হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রাপ্ত ফুটেজগুলোতে পুলিশের সহায়তায় তাঁর পালিয়ে যাওয়ার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে।

ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, গত ২৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ঢাকার আদালত থেকে ৩০ জন আসামিকে নিয়ে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল প্রিজন ভ্যানটি। তাঁতীবাজারের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে পৌঁছানোর পর গাড়িটির গতি কমিয়ে দেওয়া হয়। পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ওই সময়ে প্রিজন ভ্যানের দায়িত্বে থাকা উপপরিদর্শক (এসআই) প্রবীর কুমার বিশ্বাস যানজটের সুযোগ নিয়ে গাড়ির পেছনের দরজা খুলে দেন। এরপর তিনি নিজেই ভেতরে ঢুকে দুই আসামিকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন।

ফুটেজে দেখা যায়, প্রিজন ভ্যান থেকে বের হওয়া দ্বিতীয় আসামি ছিলেন ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজের মালিক খাইরুল বাশার। সাদা জামা পরা খাইরুল বাশারকে পিচ্চি রাজার সঙ্গে গাড়ি থেকে নেমে সড়কে নামতে দেখা যায়। তবে কয়েক সেকেন্ড পর খাইরুল বাশার পুনরায় প্রিজন ভ্যানে ফিরে যান এবং চালকের পাশের আসনে বসেন। কিন্তু পিচ্চি রাজা আর গাড়িতে ফেরেননি; তিনি সামনের দিকে হাঁটতে থাকেন। তাঁর পেছনে পেছনে হেঁটে যান লাল জামা পরা এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার বলেন, “এরপর সেখান থেকে একটি প্রাইভেট কারে ওঠেন পিচ্চি রাজা ও প্রবীর কুমার বিশ্বাস।” যদিও এই দৃশ্যটি সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়েনি, তবে কমিশনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ঠিক সন্ধ্যা ছয়টায় প্রবীর কুমার বিশ্বাস ও পিচ্চি রাজাকে ছাড়াই প্রিজন ভ্যানটি গন্তব্যের দিকে রওনা দেয়। মাত্র দুই মিনিটের ব্যবধানে ৩০ মামলার আসামি পিচ্চি রাজা সবার চোখের আড়াল হয়ে যান।

পুলিশের ভাষ্যমতে, পিচ্চি রাজাকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ করে দিতে এবং পালিয়ে যাওয়ার পথ প্রশস্ত করতেই প্রিজন ভ্যান থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে, প্রিজন ভ্যানে এসি থাকায় আরামদায়ক ভ্রমণের সুযোগ করে দিতে খাইরুল বাশারকে চালকের পাশে বসানো হয়।

তদন্তকারী পুলিশ জানিয়েছে, পিচ্চি রাজাকে পালিয়ে যেতে সহায়তার এই পরিকল্পনা ঘটনার দুই দিন আগেই করা হয়েছিল। এই ষড়যন্ত্রে প্রিজন ভ্যানের চালক এবং রাজার বোন তাসলিমা যুক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে।

এই গুরুতর ঘটনায় এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস, প্রিজন ভ্যানের চালক নায়েক কামাল হোসেন এবং রাজার বোন তাসলিমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার গাজীপুরের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক জুবায়ের রশিদ তাঁদের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।

এর আগে গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার জানান, পিচ্চি রাজার পালানোর ঘটনায় আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে একজন ব্যক্তিগত গাড়ির চালক এবং পিচ্চি রাজার এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় রয়েছেন।

তবে সিসিটিভি ফুটেজে প্রিজন ভ্যান থেকে নামার পর পিচ্চি রাজা কোন গাড়িতে করে কোথায় গিয়েছেন, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দাবি, তাঁকে ধরতে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ১৯ মে সন্ধ্যায় নেপাল থেকে দেশে ফেরার পথে স্ত্রী ও শ্যালকসহ ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পিচ্চি রাজাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি কারাগারে অবস্থান করছিলেন।