গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়ার পথে প্রিজন ভ্যান থেকে আসামি রাজা ওরফে পিচ্চি রাজার পালিয়ে যাওয়ার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য—ঢাকার তাঁতীবাজার এলাকায় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা পরিকল্পিতভাবেই পিচ্চি রাজাকে প্রিজন ভ্যান থেকে ছেড়ে দিয়েছেন। এই পুরো প্রক্রিয়ায় একজন উপপরিদর্শক (এসআই) নিজেই ভ্যানের তালা খুলে তাকে একটি প্রাইভেট কারে তুলে দিয়ে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেন। পরবর্তীতে ঘটনাটিকে আড়াল করতে পুলিশ সদস্যরা একটি ‘নাটক’ সাজান।

গাজীপুর মহানগর পুলিশের (জিএমপি) গঠিত তিন সদস্যের একটি পর্যবেক্ষণ কমিটি এই ঘটনায় প্রিজন ভ্যানের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে। এই গুরুতর গাফিলতা ও দুর্নীতির অভিযোগে ইতিমধ্যে পাঁচ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও দায়ের করা হয়েছে। বরখাস্ত হওয়া পুলিশ সদস্যরা হলেন—প্রিজন ভ্যানের দায়িত্বে থাকা এসআই প্রবীর কুমার, চালক কামাল হোসেন, কনস্টেবল জাকির হোসেন, মো. সাকিব এবং শাকিল হোসেন।

পিচ্চি রাজার পালিয়ে যাওয়ার প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে আজ সোমবার দুপুর ১২টায় নিজ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানান জিএমপি কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে আটটার দিকে ঢাকা জেলা জজ আদালত থেকে ২৯ জন আসামিকে নিয়ে প্রিজন ভ্যানটি কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের দিকে যাচ্ছিল। ভ্যানটি যখন গাজীপুর মহানগরের কোনাবাড়ী থানার বাইমাইল এলাকায় পৌঁছায়, তখন দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা দাবি করেছিলেন যে, শৌচকর্মের কথা বলে পিচ্চি রাজা ভ্যান থেকে পালিয়ে গেছেন। তবে জিএমপির তদন্তে পুলিশ সদস্যদের দেওয়া ওই বক্তব্যের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।

বিষয়টি নিশ্চিত করে জিএমপি কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “প্রিজন ভ্যানের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা পিচ্চি রাজাকে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু কত টাকার বিনিময়ে তাঁরা কাজটি করেছেন, সেটি এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে প্রিজন ভ্যানের চালক নায়েক কামাল হোসেনের বাড়ি থেকে ৬০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।”

এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দুই পুলিশ সদস্য এবং পিচ্চি রাজার এক বোনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন প্রবীর কুমার বিশ্বাস, কামাল হোসেন এবং পিচ্চি রাজার বোন তাসলিমা।

উল্লেখ্য, গত ১৯ মে ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে পিচ্চি রাজাকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। পুলিশের ভাষ্যমতে, তিনি ওই এলাকার শীর্ষ মাদক কারবারিদের একজন এবং তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।

পুলিশ কমিশনার আরও জানান, প্রকৃতপক্ষে প্রিজন ভ্যানটি যখন ঢাকার তাঁতীবাজারের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কাছে পৌঁছায়, তখন সেটি থামানো হয়। এরপর প্রিজন ভ্যানের দায়িত্বে থাকা এসআই প্রবীর কুমার চালক কামাল হোসেনের কাছ থেকে ভ্যানের চাবি নেন। তিনি ভ্যানের তালা খুলে পিচ্চি রাজা এবং খাইরুল বাশার নামের আরেক হাজতিকে নিচে নামিয়ে আনেন। খাইরুল বাশারকে চালকের পাশের আসনে বসানো হলেও পিচ্চি রাজাকে নিয়ে প্রবীর কুমার আর প্রিজন ভ্যানে ওঠেননি।

তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, প্রিজন ভ্যান থেকে নামানোর পর প্রবীর কুমার একটি প্রাইভেট কারে পিচ্চি রাজাকে তুলে দিয়ে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেন। দীর্ঘ সময় পর প্রবীর নিজেও ভ্যানে ফেরেননি। একপর্যায়ে গাজীপুরের বাইমাইল এলাকায় তিনি পুনরায় প্রিজন ভ্যানে ওঠেন এবং অন্য পুলিশ সদস্যদের সাথে মিলে পিচ্চি রাজার পালিয়ে যাওয়ার একটি সাজানো নাটক মঞ্চস্থ করেন।

পিচ্চি রাজার পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় গাজীপুর কোনাবাড়ী থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দক্ষিণ বিভাগকে। ওই মামলার প্রেক্ষিতেই প্রবীর কুমারসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বাকি অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে পুলিশের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।