চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) উপাচার্য পরিবর্তনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অচলাবস্থা দিন দিন আরও প্রকট হয়ে উঠছে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ হয়ে গেছে, শিক্ষাপঞ্জি পুরোপুরি বিপর্যস্ত এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমগুলোও মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, এই সংকট নিরসনে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর বা আনুষ্ঠানিক আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর পড়াশোনা এভাবে বন্ধ থাকার পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এই দীর্ঘসূত্রিতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রশ্ন উঠছে, উপাচার্য পদে কে দায়িত্ব পালন করবেন—সেই বিরোধের মাশুল শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন দিয়ে কেন দিতে হবে?
সংকটের সূত্রপাত হয় যখন অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় সরিয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এত স্বল্প সময়ের মধ্যে একজন উপাচার্যকে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা কোথায় ছিল, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা শিক্ষক বা শিক্ষার্থীরা পাননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ সাবেক উপাচার্যের কাজের প্রশংসা করেছেন এবং তাঁকে আরও সময় দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। সরকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে যথাযথ যৌক্তিক ব্যাখ্যা না থাকায় ক্ষোভের পাশাপাশি সন্দেহও তৈরি হয়েছে। যেকোনো প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে আকস্মিক পরিবর্তন আনলে তার যৌক্তিকতা স্পষ্টভাবে জানানো দায়িত্বশীল প্রশাসনের অন্যতম প্রধান কর্তব্য।
বর্তমানে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষার্থীদের অপূরণীয় ক্ষতি। চলমান পরীক্ষাগুলো মাঝপথে থেমে গেছে এবং নির্ধারিত পরীক্ষাগুলোও শুরু করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। যাঁদের এই বছর পড়াশোনা শেষ করার কথা ছিল, তাঁদের হয়তো আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে। শিক্ষাজীবন দীর্ঘায়িত হলে আবাসন ও জীবনযাপনের বাড়তি ব্যয় শিক্ষার্থীদের বহন করতে হয়। তাই সেশনজট কেবল শিক্ষাপঞ্জির সমস্যা নয়, বরং শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবারের ওপর এটি একটি বাস্তব অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা জানিয়েছেন, সংকট কেটে গেলে তাঁরা বাড়তি ক্লাস এবং ছুটির সময়ে পরীক্ষা নিয়ে এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেন। তবে ভবিষ্যতে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যাবে—এই আশ্বাস বর্তমান অচলাবস্থাকে দীর্ঘায়িত করার কোনো যুক্তি হতে পারে না।
সংকট নিরসনে সরকারের বিভিন্ন স্তরে যোগাযোগ এবং আলোচনার আহ্বান জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে কিছু আহ্বানে আন্দোলনকারীরা সাড়া দেননি। অন্যদিকে, শিক্ষকদের ভাষ্যমতে, আন্দোলন স্থগিত করার শর্তে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষের অবস্থানই পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। আলোচনা শুরুর আগেই যদি আন্দোলন প্রত্যাহারের শর্ত দেওয়া হয়, তবে সমাধানের পথ সংকুচিত হয়ে পড়ে। আবার শুধু পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে সংলাপ এড়িয়ে চললেও এই অচলাবস্থা দূর হবে না। যেহেতু মতপার্থক্য বিদ্যমান, তাই আলোচনার প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি; আলোচনার আগেই সব বিষয়ে একমত হওয়ার দাবি বাস্তবসম্মত নয়।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের দাবি এবং প্রতিবাদের অধিকারকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। তবে সর্বাত্মক শাটডাউন এবং একাডেমিক ও প্রশাসনিক দপ্তরের নিষ্ক্রিয়তা যে শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদেরই ক্ষতি বাড়িয়ে দিচ্ছে, সেটিও আন্দোলনকারীদের বিবেচনায় নিতে হবে। দাবি নিয়ে আলোচনা চলাকালীন ক্লাস ও পরীক্ষা চালুর একটি গ্রহণযোগ্য পথ খুঁজে বের করতে হবে। এই সমঝোতা তৈরিতে শিক্ষকদের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। তাঁদের অবস্থান যদি প্রকৃতপক্ষেই শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে হয়, তবে শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় চালু করার পথ খোঁজা সেই দায়িত্বেরই অংশ।
এদিকে নতুন উপাচার্য ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে না পারায় একটি কার্যকর নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। বাইরে থেকে দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা করা বা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা এই সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে, সংকট সমাধানের প্রচেষ্টা যেন কেবল বিচ্ছিন্ন ফোনালাপ বা অনানুষ্ঠানিক আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী, শিক্ষক প্রতিনিধি এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠক করতে হবে। সেই সাথে স্থগিত পরীক্ষা, বন্ধ ক্লাস এবং প্রশাসনিক কাজ চালুর একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা জানাতে হবে। চুয়েটের এই সংকট আর দীর্ঘায়িত হতে দেওয়া যাবে না। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই ছেলেখেলা বন্ধ করতে হবে।