একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বা ভিসি হলেন সেই প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ একাডেমিক এবং নৈতিক অভিভাবক। কিন্তু সেই অভিভাবককে যখন গোপনীয়তার আশ্রয় নিয়ে, ভবনের তালা ভেঙে এবং ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের নেতাদের প্রটোকলে দপ্তরে গিয়ে বসতে হয়, তখন বিষয়টি অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ মনে হয়। এমন ঘটনা কেবল ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসকে কলঙ্কিতই করে না, বরং দেশের সামগ্রিক উচ্চশিক্ষা-ব্যবস্থার মেরুদণ্ডের ওপরও আঘাত হানে।

রাজধানী ঢাকা থেকে অনেক দূরে, চট্টগ্রাম শহর থেকেও ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) এমন ঘটনা ঘটেছে। ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে হয়তো নাগরিক সমাজে এই বিষয়টি নিয়ে খুব একটা আলোচনা হয়নি। তবে ভেবে দেখুন, আজ যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় তথা বুয়েটে এমন ঘটনা ঘটত, তবে কেমন তোলপাড় হতো?

সকালের খবরে জানা গেছে, চুয়েট ক্যাম্পাসে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের টানা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ আন্দোলনের মুখে নতুন নিয়োগ পাওয়া উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম ছাত্রদলের নেতাদের সঙ্গে নিয়ে উপাচার্য ভবনের তালা ভেঙে দপ্তরে প্রবেশ করেছেন।

এখানেই প্রশ্ন ওঠে, যে পদে বসতে হলে একাডেমিক গ্রহণযোগ্যতা ও সম্মতির প্রয়োজন হয়, সেখানে দলীয় ছাত্রসংগঠনের প্রটোকল ও তালা ভাঙার মহড়া দিয়ে একজন উপাচার্য কীভাবে তাঁর প্রশাসন পরিচালনা করবেন? চুয়েটে তৈরি হওয়া এই নজিরবিহীন পরিস্থিতি কোনো সাধারণ ছাত্র-অসন্তোষ নয়; বরং এটি ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক হঠকারিতা এবং বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসনের ওপর হস্তক্ষেপের সরাসরি ফল।

চুয়েটের এই সংকটের মূল সূচনা হয় গত ২১ সেপ্টেম্বর, যখন মাত্র ৫৬ দিন দায়িত্ব পালন করা উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে আকস্মিক অব্যাহতি দেওয়া হয়। কেন তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হলো কিংবা তাঁর কাজে কী ত্রুটি ছিল, সে বিষয়ে প্রজ্ঞাপনে বা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ন্যূনতম ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। অধ্যাপক সায়েম ছিলেন চুয়েটেরই প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক, যিনি খুব অল্প সময়েই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন, গবেষণা স্কলারশিপ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার গঠনে তাঁর নানামুখী ইতিবাচক ভূমিকা সর্বজনবিদিত। এমন একজন গ্রহণযোগ্য ও কর্মঠ শিক্ষককে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই হঠাৎ সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলতার অভাবকেই স্পষ্ট করে তোলে।

যে ভিসিকে নিজের চেয়ারে বসতে ছাত্রসংগঠনের ক্যাডার প্রটোকল নিতে হয়, তিনি পরবর্তী সময়ে কীভাবে সব শিক্ষার্থীদের অভিভাবক হবেন? এটি স্পষ্টতই ক্যাম্পাসে নতুন করে দলীয় বলয় তৈরির চেষ্টা এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়ার এক চরম দেউলিয়াত্ব।

চুয়েটের শিক্ষক সমিতি ও শিক্ষার্থীরা যখন এর প্রতিবাদে প্রশ্ন তুলেছেন, তখন কোনো আলোচনা না করে নতুন ভিসি চাপিয়ে দেওয়া সংকটের আগুনে কেবল ঘি ঢেলেছে। নতুন নিয়োগ পাওয়া উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমের প্রশাসনিক ইতিহাস মোটেও বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়।

তিনি খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) শিক্ষক এবং সেখানে সহ-উপাচার্য (প্রো-ভিসি) থাকাকালে ছাত্ররাজনীতিকেন্দ্রিক সংঘাত ও দীর্ঘ অচলাবস্থার মুখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক অব্যাহতি পেয়েছিলেন। কুয়েটে ব্যর্থ ও বিতর্কিত ভূমিকা রাখা একজন শিক্ষককে চুয়েটের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার যৌক্তিকতা কী?

তা ছাড়া চুয়েটে যোগদানের পরপরই অধ্যাপক শরীফুল আলম যে মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তা কোনো সচেতন শিক্ষকের কাছ থেকে আশা করা যায় না। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আন্দোলন নস্যাৎ করতে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে সোনালী ব্যাংকে নির্দেশ পাঠিয়ে সবার বেতন-ভাতা আটকে দেন। আইনি দোহাই দিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বন্ধ করে দিয়ে একজন ভিসি কীভাবে এমন ক্ষমতাচর্চা করতে পারলেন!

শেষ পর্যন্ত কর্মচারীরা ব্যাংক ঘেরাও কর্মসূচি দিলে বাধ্য হয়ে সেই বেতন ছাড়তে হয়। যে উপাচার্য শুরুতেই পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারকে শত্রু পক্ষ বানিয়ে তাদের বেতন আটকে দেন, তাঁর অধীনে বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে সুস্থভাবে পরিচালিত হতে পারে?

আজ সোমবার সকালে ক্যাম্পাসের মূল ফটকে কেবল ‘শিক্ষক’ পরিচয় দিয়ে ঢুকে ছাত্রদলের নেতাদের সঙ্গে নিয়ে তালা ভেঙে ভিসির চেয়ারে বসার দৃশ্যটি শিক্ষাঙ্গনের জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে আসীন ব্যক্তি হবেন সবার ঊর্ধ্বে। অথচ নতুন ভিসি দপ্তরে বসলেন ছাত্রদল সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদককে পাশে বসিয়ে। এই দৃশ্যের পর কি কোনো শিক্ষক বা সাধারণ শিক্ষার্থী এই ভিসির কাছ থেকে নিরপেক্ষ বা নৈতিক আচরণ আশা করতে পারেন?

যে ভিসিকে নিজের চেয়ারে বসতে ছাত্রসংগঠনের ক্যাডার প্রটোকল নিতে হয়, তিনি পরবর্তী সময় কীভাবে সব শিক্ষার্থীদের অভিভাবক হবেন? এটি স্পষ্টতই ক্যাম্পাসে নতুন করে দলীয় বলয় তৈরির চেষ্টা এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়ার এক চরম দেউলিয়াত্ব।

প্রশাসনের এই গোঁয়ার্তুমি ও ভুল সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় মাশুল গুনছেন চুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। টানা শাটডাউনের কারণে অন্তত ছয়টি বিভাগের চূড়ান্ত বর্ষ ও সেমিস্টারের পরীক্ষা স্থগিত হয়ে গেছে। শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। একটি বছর বা সেমিস্টার পিছিয়ে যাওয়া মানে একজন প্রকৌশল প্রার্থীর জীবনে চরম আর্থিক ও মানসিক বিপর্যয় নেমে আসা।

শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, অধ্যাপক সায়েমকে সরিয়ে দেওয়া এবং বল প্রয়োগ করে বিতর্কিত ভিসি বসানোর সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা না করা পর্যন্ত তাঁরা স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরবেন না। তাহলে সরকার বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় কার স্বার্থে হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ভেস্তে দিয়ে একজন ব্যক্তির পদে থাকা নিশ্চিত করতে চাইছে?

জোর করে তালা ভেঙে চেয়ারে বসা যায়, কিন্তু শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মন জয় করে একটি বিশ্ববিদ্যালয় চালানো যায় না। চুয়েটের বর্তমান সংকট কাটাতে হলে সরকারকে অবিলম্বে এই একগুঁয়ে নীতি ত্যাগ করতে হবে। অধ্যাপক সায়েমকে কেন সরানো হলো, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা দরকার এবং যদি সিদ্ধান্তটি ভুল বা রাজনৈতিক চাপে হয়ে থাকে, তবে তা সংশোধন করে চুয়েটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।

আন্দোলনরত শিক্ষক সমিতি, শিক্ষার্থী প্রতিনিধি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করে অচলাবস্থা নিরসনের পথ বের করতে হবে। উপাচার্যের দপ্তরকে রাজনৈতিক ক্যাডারমুক্ত করে একাডেমিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতাচর্চায় বিশ্ববিদ্যালয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়, বিক্ষোভের আগুন জ্বলে। এসব তো এ দেশে নতুন কিছু নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অসন্তোষ দেশের রাজনীতি কতটা ঘুরিয়ে দেয়, তা-ও আমাদের জানা।

এরপরও সরকার কেন অল্প দিনেই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক অসন্তোষের পরিস্থিতি তৈরি করল, সেটি বোঝা গেল না। জোর করে ভিসি বসিয়ে কীভাবে সরকার শান্তিপূর্ণভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয় চালানোর আশা করে? রাজনৈতিক প্রটোকলে যেভাবে তালা ভেঙে দায়িত্ব নেওয়ার দৃশ্য তৈরি হলো, এর মধ্য দিয়ে কি ক্যাম্পাসকে আরও উত্তপ্ত পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেওয়া হলো না?