টানা ৩৬ দিনের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি সমাপ্ত করে আজ বুধবার ক্লাসে ফিরেছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) শিক্ষার্থীরা। তবে ক্লাস ও পরীক্ষা পুনরায় চালু হলেও বিদায়ী উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

আজ সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও পরিকল্পনা বিভাগে সরেজমিনে দেখা যায়, বিভিন্ন ব্যাচের ক্লাস পৃথকভাবে চলছে। যদিও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার কিছুটা কম ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও কয়েকটি বিভাগে গিয়েও একই চিত্র পরিলক্ষিত হয়। নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ফৌজিয়া গুলশানা রশিদ জানান, ‘আজ আমাদের বিভাগে সব ব্যাচেই ক্লাস শুরু হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হয়েছেন।’

তবে সব বিভাগে আজ ক্লাস শুরু হয়নি। তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগ এবং বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ এর অন্তর্ভুক্ত। সংশ্লিষ্ট দুটি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আজ ক্লাস শুরুর কথা থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) গঠিত পরামর্শক কমিটির সঙ্গে বৈঠকের কারণে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ক্লাসে অংশ নিতে পারেননি। আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে এসব বিভাগে ক্লাস শুরু হবে। তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘আমাদের বিভাগ ক্লাস নেওয়ার জন্য শতভাগ প্রস্তুত ছিল। তবে ইউজিসির পরামর্শক কমিটির সঙ্গে শিক্ষকদের বৈঠক রয়েছে, ছাত্রদেরও আছে। তাই তাঁরা আসেননি।’

অন্যদিকে, কম্পিউটারবিজ্ঞান ও কৌশল বিভাগেও আজ ক্লাস শুরু হয়নি বলে জানান বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক প্রণব কুমার ধর। তিনি উল্লেখ করেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক আবেদন পাননি তিনি। শিক্ষার্থীরা যদি কোর্স সমন্বয়কের মাধ্যমে আবেদন করেন, তবে তা বিবেচনা করে ক্লাস শুরুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এর আগে গত রোববার দুপুরে চুয়েটের শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফেরার বিষয়ে শিক্ষকদের সহযোগিতা চেয়ে একটি খোলা চিঠি প্রদান করেন। একই দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভায় শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরার আহ্বান জানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভা শেষে শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক সামিউন বাসির জানান, সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো নিজেদের সুবিধামতো ক্লাস শুরুর তারিখ নির্ধারণ করবে। পরবর্তীতে ওইদিন রাতেই এক বিবৃতির মাধ্যমে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা আজ থেকে ক্লাসে ফেরার সিদ্ধান্ত জানান।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একজন এবং পুরকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী নাফিস হাসান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় আমাদের শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। আমরা চাই, দ্রুত স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ফিরে আসুক। তাই আমরা ক্লাস শুরু করছি।’

তবে বিদায়ী উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবি তারা ছাড়ছেন না। নাফিস হাসান আরও বলেন, ‘তবে ক্লাসে ফেরা মানে আমাদের ন্যায্য দাবি থেকে সরে আসা নয়। সায়েম স্যারের পুনর্বহালের দাবিতে আমাদের আন্দোলন চলবে। আমরা সংঘাত নয়, সংকটের সম্মানজনক সমাধান চাই। আশা করি, আমাদের শিক্ষাজীবন সচল রাখার পাশাপাশি দাবির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।’

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান অচলাবস্থা নিরসনে শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন অংশীজনদের সঙ্গে আজ মতবিনিময় করার কথা রয়েছে ইউজিসি গঠিত পরামর্শক কমিটির। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, আজ সকাল ১০টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময় চলবে। এরপর বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এবং বেলা আড়াইটা থেকে ৩টা পর্যন্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হবে। সবশেষে বেলা সাড়ে ৩টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করার কথা রয়েছে কমিটির।

উল্লেখ্য, গত ২১ সেপ্টেম্বর চুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে কুয়েটের অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষার্থীরা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু করেন। একই দাবিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও কর্মবিরতি পালন করেন, যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

এই আন্দোলনের মধ্যেই ১২ অক্টোবর সকাল ৯টার দিকে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। ছাত্রদল নেতাদের সহায়তায় উপাচার্য ভবনের তালা ভেঙে তিনি নিজ দপ্তরে প্রবেশ করেন। বিষয়টি জানতে পেরে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা উপাচার্য ভবনের সামনে অবস্থান নেন এবং দুপুর ১২টার মধ্যে উপাচার্যকে কার্যালয় ত্যাগ করার আলটিমেটাম দেন। দুপুর ১২টার পর শিক্ষার্থীরা ভবনের ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন এবং বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

ভবনে তালা দেওয়ার ফলে উপাচার্যসহ মোট ১১ জন ভেতরে আটকা পড়েন। পরদিন উপাচার্য অসুস্থ বোধ করার কথা জানান, যার ফলে তাঁকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে দুই চিকিৎসক ভেতরে যান। প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর তাঁদের উদ্ধার করা হয় এবং উপাচার্যকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সুস্থ হয়ে ফেরার পর তিনি অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করেন।

পরবর্তীতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে চুয়েটের সংকট নিরসনে ইউজিসি ছয় সদস্যের একটি পরামর্শক কমিটি গঠন করে। ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক আবদুল্লাহ-আল-মামুনকে প্রধান করে গঠিত এই কমিটির সদস্যসচিব নিযুক্ত হন সংস্থাটির অতিরিক্ত পরিচালক মো. মহিবুল আহসান। কমিটির অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) উপাচার্য এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) মো. মাহবুবুল হক পাটোয়ারী।