সকাল এবং বিকেলে রাস্তার মোড়ে মোড়ে ধীরলয়ে প্যাডেল ঘুরিয়ে বাইসাইকেল চালিয়ে যেতে দেখা যায় এক বৃদ্ধকে। তাঁর সোজা হয়ে বসার ভঙ্গি এবং চোখের সতেজতা দেখে বয়স আন্দাজ করা বেশ কঠিন। তিনি আবদুস সামাদ প্রামাণিক (৭৭), যার ব্যবহৃত বাইসাইকেলটি প্রায় ৬০ বছরের পুরনো।

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার নাজিরপুর গ্রামের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সামাদ প্রামাণিক একজন অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক। স্থানীয়দের কাছে তিনি ‘সামাদ প্রফেসর’ নামে পরিচিত। চার-পাঁচ দশক ধরে এলাকার মানুষ তাঁকে এই একই সাইকেলে যাতায়াত করতে দেখে আসছেন।

১৯৪৯ সালে জন্মগ্রহণ করা সামাদ প্রামাণিকের এই বিশেষ বাহনটি তাঁর পরিবারের দেওয়া। ১৯৬৬ সালে মাত্র ২৮০ টাকায় ইংল্যান্ডের ‘র‍্যালি’ ব্র্যান্ডের একটি বাইসাইকেল কিনে দিয়েছিলেন তাঁর পরিবার। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই সাইকেলটি আজও সচল এবং তিনি নিয়মিত এটি চলাচলে ব্যবহার করছেন।

গত শনিবার বাগমারার ভবানীগঞ্জে উপজেলা বন বিভাগের কার্যালয়ের সামনে দেখা মেলে সামাদ প্রামাণিকের। পাশেই রাখা ছিল তাঁর সেই ঐতিহাসিক বাইসাইকেলটি। সেখানে তিনি তাঁর সহযোদ্ধা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ ও আড্ডায় মেতেছিলেন।

১৯৬৯ সালে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে এই সাইকেলটি নিয়েই রাজশাহী শহরে যান সামাদ। তবে দুই বছর পর উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে যায়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের ডাক এলে প্রিয় সাইকেলটি বাড়িতে রেখে তিনি যুদ্ধে যোগ দেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাড়ি ফিরে তিনি দেখেন অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তবে তাঁর সাইকেলটি অক্ষত অবস্থায় ছিল। সেটি নিয়েই তিনি পুনরায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যান এবং ১৯৭৩ সালে সমাজকর্ম বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

কর্মজীবনেও এই সাইকেলটিই ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। ১৯৭৭ সালে ভবানীগঞ্জ কলেজে গ্রন্থাগারিক হিসেবে তাঁর পেশাগত জীবন শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে তিনি একই কলেজের সমাজকর্ম বিভাগে শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। প্রতিদিন বাড়ি থেকে কলেজে প্রায় ছয় কিলোমিটার পথ তিনি এই সাইকেলে করেই পার হতেন। এমনকি ২০০৯ সালে অবসরের দিনটিতেও তিনি সাইকেল চালিয়েই কলেজে গিয়েছিলেন। অবসরের পর তাঁর এই যাত্রা থেমে থাকেনি; তিনি এখনো প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫ কিলোমিটার বাইসাইকেল চালান। সকালে বন বিভাগ কার্যালয়ের সামনে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে আড্ডা এবং বিকেলে ব্যক্তিগত নানা কাজ—সবখানেই তাঁর সঙ্গী হয়ে থাকে সেই ‘র‍্যালি’ সাইকেলটি।

সামাদ প্রামাণিক জানান, দীর্ঘ সময়ে সাইকেলটির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ কয়েকবার পরিবর্তন করতে হয়েছে। তিনি সবসময় চেষ্টা করতেন র‍্যালির নিজস্ব যন্ত্রাংশ ব্যবহার করতে, তবে এক সময় সেগুলো না পাওয়ায় ভালো মানের অন্য যন্ত্রাংশ ও টিউব লাগিয়েছেন তিনি।

সামাদ প্রামাণিকের এই জীবনযাত্রা সম্পর্কে কথা বলেন পাশের গ্রামের বাসিন্দা, অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্বাস আলী মোল্লা। তিনি বলেন, ‘সামাদ ভাইকে আমাদের ছাত্রজীবন থেকেই একই সাইকেলে দেখছি। এই বয়সেও তিনি তরুণের মতো স্বাচ্ছন্দ্যে সাইকেল চালান। এটা আমাদের সবাইকে অনুপ্রাণিত করে।’

ভবানীগঞ্জ কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী এবং বর্তমানে বাগমারা কলেজের সহকারী অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, বহু বছর ধরে যত্নে রাখা ওই বাইসাইকেলটি সামাদ স্যারের স্মৃতি ও ভালোবাসার প্রতীক। তিনি আরও বলেন, ‘ছাত্রজীবনে সামাদ স্যারকে যেমন নিয়মিত সাইকেলে কলেজে আসতে-যেতে দেখেছি, এখনো একইভাবে দেখি।’

শারীরিক সুস্থতা এবং নিজের বাহনের প্রতি গভীর অনুরাগের কথা জানিয়ে সামাদ প্রামাণিক বলেন, ‘বাইসাইকেল চালাতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। এই বয়সেও যে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ আছি, এর বড় অবদান নিয়মিত সাইকেল চালানো। এটা এখন আর শুধু যান নয়, আমার পরিবারের একজন সদস্যের মতো। নিজের শরীরের মতো সাইকেলেরও নিয়মিত যত্ন নিই। এর প্রতি গভীর মায়া জন্মে গেছে।’