পর্তুগাল জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর চলে যাওয়ার সেই নাটকীয় ঘটনার পর দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে অবশেষে মুখ খুলেছেন পর্তুগালের অধিনায়ক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে একটি দীর্ঘ বিবৃতির মাধ্যমে পুরো ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। এই বিবৃতিতে ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার পাশাপাশি পর্তুগালের সাধারণ মানুষ, ফুটবল সমর্থক এবং সতীর্থদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন রোনালদো। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, যেকোনো সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাঁর কাছে সত্যের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।

রোনালদোর দাবি অনুযায়ী, পর্তুগালের বর্তমান কোচ হোর্হে জেসুসের সঙ্গে তাঁর একাধিকবার আলোচনা হওয়া সত্ত্বেও কোচ তাঁর দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেননি। শেষ পর্যন্ত আর কোনো প্রতিশ্রুতির অপেক্ষায় না থেকে জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তবে ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার বিষয়টি ভুল ছিল বলে স্বীকার করে নিয়ে তিনি প্রয়োজনীয় শাস্তি মেনে নেওয়ার কথা বলেছেন ৪১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড।

রোনালদোর সেই দীর্ঘ বিবৃতির পূর্ণাঙ্গ রূপটি নিচে তুলে ধরা হলো:

“যেমনটা আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, জাতীয় দলের যাত্রার সর্বশেষ অধ্যায়কে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো প্রথম পুরুষে এবং সরাসরি বর্ণনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

২০২৬ বিশ্বকাপের পর আমি পর্তুগালের মানুষের জন্য একটি বার্তা তৈরি করেছিলাম। সেটি এখনো আমার কাছে আছে। সেখানে এমন কিছু কথা লিখেছিলাম, যা জাতীয় দলের সঙ্গে শেষবারের মতো বিদায় নেওয়ার সময় তাঁদের বলতে চেয়েছিলাম।

টুর্নামেন্ট শেষে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরার বিমানে ফেডারেশনের সভাপতি আমাকে জাতীয় দল থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে অনুরোধ করেন এবং জোর দিয়ে বলেন, পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন চায় আমি যেন খেলা চালিয়ে যাই।

এরপরই তিনি আমাকে বর্তমান জাতীয় দলের কোচের নাম নিয়ে আমার মতামত জানতে চান। অন্য কয়েকজনের নামও তিনি বিবেচনা করছিলেন, যদিও তাঁদের নাম আমাকে বলেননি।

আমি ফেডারেশনের সভাপতিকে বলেছিলাম, আমার মতে তিনিই আদর্শ পছন্দ। তাই বর্তমান জাতীয় দলের কোচকে যেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো, সেদিন আমি সত্যিই খুশি হয়েছিলাম। সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল। ফলাফলও সেটাই প্রমাণ করে।

কয়েক দিন পর নতুন জাতীয় দলের কোচ আমাকে প্রথমবার ফোন করেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে আমার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। আমি রাজি হই এবং আমরা একটি দিন ঠিক করি। ‘আমার ছুটি শেষ হওয়ার দিন।’

আমাদের দেখা হয়েছিল ফুটবল সিটিতে, যেখানে আমার দল মৌসুম শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

সেদিন কোচ আমাকে বলেছিলেন, তিনি আমাকে তাঁর পরিকল্পনায় রেখেছেন এবং তাঁর প্রকল্পে আমার উপস্থিতি অপরিহার্য। তিনি আমার তাৎক্ষণিকভাবে দলে অংশ নেওয়ার একটি পরিকল্পনাও তুলে ধরেন। তিনি বলেছিলেন, আমি প্রথম ও শেষ ম্যাচ খেলব এবং শারীরিক সক্ষমতার কারণে প্রতিটি ম্যাচে তিন বা চারটি পরিবর্তন করবেন।

এরপর তিনি প্রস্তাব দেন, আমি যেন জাতীয় দলের সঙ্গে নরওয়ে ও ডেনমার্ক সফরে না যাই। তাঁর প্রস্তাব ছিল, প্রথম ম্যাচটি খেলে আমি পর্তুগালেই থাকব। এরপর দার্দাও স্টেডিয়ামে ম্যাচের আগে দলের সঙ্গে যোগ দেব।

আমি সঙ্গে সঙ্গে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করি। আমার কাছে পরিষ্কার ছিল, এটি মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। বিদেশের ম্যাচগুলো না খেলার অর্থ এই নয় যে আমি আমাদের দলের অধিনায়ক থাকব না। পর্তুগালে থেকে যাওয়ার এই বিশেষ সুবিধা ভালো উদাহরণ তৈরি করত না।

শেষ পর্যন্ত কোচ আমার বিশ্লেষণের সঙ্গে একমত হন।

এই কথোপকথনের সময় উপস্থিত ছিলেন সিমো কুতিনিও। তিনি আল নাসর ক্লাবের ক্রীড়া পরিচালক এবং সেই ব্যক্তি, যার কাছে বর্তমান জাতীয় দলের কোচ গত মৌসুমজুড়ে রিপোর্ট করতেন। ২০২৫ সালে তাঁকে আল নাসরে নিয়ে আসার ক্ষেত্রেও তিনি অন্যতম দায়িত্বশীল ব্যক্তি ছিলেন।

প্রশিক্ষণ ক্যাম্প শুরুর আগের দিন কোচ তাঁর অনুরোধে লিসবনে আমার বাড়িতে এসেছিলেন। আরেক দফা কথা হয়েছিল আমাদের। কথোপকথনটি শান্তিপূর্ণ ছিল এবং আগস্টে আমরা যে নীতিগুলোতে একমত হয়েছিলাম, সেগুলোই মেনে চলেছিলাম।

আমি আলভালাদে স্টেডিয়ামে ম্যাচটি খেলেছিলাম। আমাকে বদলি করা হলেও আমি কোনো সমস্যা তৈরি করিনি। আমি নিজেই অধিনায়কের আর্মব্যান্ড ব্রুনো ফার্নান্দেজকে পরিয়ে দিয়েছিলাম। তখন আমার একবারও মনে হয়নি, জাতীয় দলের খেলোয়াড় ও অধিনায়ক হিসেবে এটাই হয়তো আমার শেষ সময়।

সেদিন আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল আমাদের জয়। জেতা সব সময়ই ভালো ব্যাপার। আর পর্তুগালে, আমার দেশের জন্য, জয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

নরওয়ের ম্যাচের দিন দুপুরে জাতীয় দলের কোচের সহকারী দলের সঙ্গে দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় আমার টেবিলে এসে বললেন, কোচ আমার সঙ্গে কথা বলতে চান। আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। কোচ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি ৩০ মিনিট খেলার জন্য প্রস্তুত কি না।

আমি তখন পুরোপুরি শারীরিক পুনরুদ্ধারের দিকে মনোযোগী ছিলাম। স্বাভাবিকভাবেই সতীর্থদের সঙ্গে মিশছিলাম এবং মনে করছিলাম, সেদিন আমি খেলব না। এতে আমার কোনো সমস্যা ছিল না।

এই অনুরোধ আমার শারীরিক পুনরুদ্ধার ও অনুশীলনের পরিকল্পনার বাইরে ছিল। কারণ, মাসের ৪ তারিখ দার্দাও স্টেডিয়ামের ম্যাচেই শুধু আমার খেলার কথা ছিল। কিন্তু অবশ্যই আমি রাজি হয়েছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, প্রস্তুত থাকতে, কারণ আমি ৩০ মিনিট খেলব।

এরপর যা ঘটেছে, তা সবারই জানা। দ্বিতীয়ার্ধের বিরতি থেকেই আমি ওয়ার্মআপ শুরু করি। মিনিটগুলো পার হতে থাকে। কিন্তু কেউ আমাকে মাঠে নামার জন্য ডাকেনি। কোচ তাঁর প্রতিশ্রুতি রাখেননি।

ম্যাচ শেষে আমি শুধু চেয়েছিলাম সবকিছু একটি জয় দিয়ে শেষ হোক এবং আমি একা থাকতে চেয়েছিলাম। আমি সমর্থকদের অভিবাদন জানাতে যাইনি। এটি একটি ভুল, যার সম্পূর্ণ দায় আমি নিজেই নিচ্ছি। এমনটা হওয়া উচিত ছিল না।

সেখানে যারা আমাদের দারুণ উৎসাহ দিয়েছিলেন, সেই পর্তুগালের মানুষদের কাছে আমি ক্ষমা চাইছি। সমর্থকদের কাছে ক্ষমা চাইছি। যারা আমাকে দেখতে সেখানে গিয়েছিলেন, তাঁরা পর্তুগিজ না হলেও, তাঁদের কাছেও ক্ষমা চাইছি। হয়তো আমি তাঁদের হতাশ করেছি।

৪৮ ঘণ্টা পর আমি, কোচ এবং সিমো কুতিনিও কথা বলেছিলাম। কারণ, তিনি আমাদের কথোপকথনগুলো অনুসরণ করছিলেন।

এটি ছিল খুব গভীর এবং খোলামেলা একটি মুহূর্ত। কোনো কিছুই গোপন রাখা হয়নি।

আমরা একমত হয়েছিলাম, এই ‘ঘটনা’ শেষ করার একমাত্র উপায় হলো কোচ ব্যক্তিগতভাবে আমাকে যা বলেছিলেন, সেটি সিমো কুতিনিওর সামনে আবার বলা। তবে এবার সংবাদ সম্মেলনের কক্ষে।

চুক্তিটি ছিল সহজ। কোচ সংবাদ সম্মেলন শুরু করবেন এই বিষয়টি দিয়ে। সত্যটা বলে তিনি বিষয়টির ইতি টানার চেষ্টা করবেন। তিনি বলবেন, আমি কখনো কয়েক মিনিটের জন্যও খেলতে চাইনি। এই প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের পরিকল্পনা একমাত্র কোচই করেছিলেন, অন্য কেউ নয়। আমাকে শুধু ওয়ার্মআপ করিয়ে ম্যাচে না খেলানো ভুল ছিল। আবার এমন হলে তিনি আর এটা করবেন না।

আমাদের সেই বৈঠক শেষ হয়েছিল কোচ আমাকে আলিঙ্গন করার অনুরোধ জানিয়ে। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সংবাদ সম্মেলনে তিনি আমাকে যা বলেছেন, সেটিই বলবেন এবং বিষয়টির সমাধান হয়ে গেছে। আমি ডেনমার্কে খেলব না, কিন্তু দার্দাওয়ের ম্যাচে খেলব। এসবই সিমো কুতিনিওর উপস্থিতিতে হয়েছিল, যেমনটা সব সময় হয়ে থাকে।

কোচের অনুরোধে তাঁর, সিমো কুতিনিও এবং তিয়াগো ক্রাভেইরোর মধ্যে একটি ভিডিও বৈঠকও হয়েছিল। সেখানে আমরা যা আলোচনা করেছিলাম, তা সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়।

একটি সংক্ষিপ্ত নথি তৈরি করা হয়েছিল। আমি ব্যক্তিগতভাবে সেটি অনুমোদন করেছিলাম। কোচের অনুরোধে সেটি তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়।

কিন্তু বৈঠকটি আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। তাঁর আচরণের সঙ্গে আমাদের বৈঠকের কোনো মিল ছিল না। আমি এমন কিছু কথা এবং আক্রমণাত্মক আচরণ শুনেছি, যেগুলো আমার কাছে অযৌক্তিক মনে হয়েছে। তাঁর এমন একটি মনোভাব ছিল, যেন তিনি ‘চান, পারেন এবং নির্দেশ দেন’। অথচ আগের দিন ব্যক্তিগত বৈঠকে তিনি আমার সঙ্গে এমন আচরণ কখনো করেননি, এমনকি পরোক্ষভাবেও নয়।

আমি যে নোটগুলো পর্যালোচনা করেছি, সেগুলো ছিল এ রকম। ডেনমার্ক নিয়ে কথা বলার আগে কিছু বিষয় পরিষ্কার করা গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি, কারণ এটাই সত্য।

১. জাতীয় দলের এই মৌসুমের জন্য আমি নিজেই ক্রিস্টিয়ানোর জন্য একটি পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছিলাম। অন্য কেউ নয়। আমাদের মধ্যে দীর্ঘ এবং অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছিল।

২. আমি জানি, সে জাতীয় দলকে কতটা ভালোবাসে এবং বিশ্বজুড়ে তার অবস্থান কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তার চেয়েও বেশি জানি, টানা ২৪ বছর ধরে জাতীয় দলের ওপর তার প্রভাব কতটা ইতিবাচক ছিল।

৩. ক্রিস্টিয়ানোর জন্য আমি যে পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছিলাম, সে সেটি গ্রহণ করেছিল।

৪. সে কখনো আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। সে ছিল অনুসরণ করার মতো একটি উদাহরণ, বিশ্বস্ত এবং পেশাদার।

৫. নরওয়ের ম্যাচটি তার জন্য আমার তৈরি করা পরিকল্পনার মধ্যে ছিল না। তবে আমার মনে হয়েছিল, প্রথম ম্যাচের পর সে শারীরিকভাবে পুনরুদ্ধার করেছে। তাই তাকে সতর্ক করেছিলাম, প্রয়োজনে হয়তো আমাকে তাকে মাঠে নামাতে হতে পারে। ক্রিস্টিয়ানো এতে রাজি হয়েছিল।

৬. পেলের বা ম্যারাডোনার মতো একজন খেলোয়াড়কে শুধু ওয়ার্মআপ করিয়ে ম্যাচে না খেলানো আমার ভুল ছিল। আজ যদি আবার একই পরিস্থিতি হতো, আমি এমনটা করতাম না।

৭. সংক্ষেপে বললে, আমি ক্রিস্টিয়ানোকে জাতীয় দলে চাই। সত্যি বলতে, অল্প নয়, আমি তাকে অনেকটাই চাই। সৌভাগ্যক্রমে, সেও আমাকে বিশ্বাস করে। সে আল নাসরে আমাকে বিশ্বাস করেছিল, এখানেও করেছে।

৮. সমর্থকদের অভিবাদন না জানানোর বিষয়ে আমরা আগেই কথা বলেছিলাম। জাতীয় দলের হয়ে ২৩০টির বেশি ম্যাচ খেলা একজন খেলোয়াড়কে পর্তুগালকে ভালোবাসা শেখানোর প্রয়োজন আমার নেই। সেটি ছিল হতাশার একটি মুহূর্ত, যা অন্য কিছু মুছে দেয় না। সমর্থকদের সবচেয়ে বেশি অটোগ্রাফ দেয়, সবচেয়ে বেশি সেলফি তোলে এবং সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা দেখায়, সেই খেলোয়াড়টিই সে। তাই শূন্য থেকে সমস্যা তৈরি করা উচিত নয়। আমরা যখন খুশি থাকি না, তখন প্রতিক্রিয়া দেখাই। এটাই সব। সুতরাং, এই নোটগুলোর কোথাও কোচ আমাকে ক্ষমা চেয়েছেন, এমন কথা উল্লেখ ছিল না।

এটি ছিল তাঁর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দ্বিতীয় ঘটনা।

আরেকটি প্রতিশ্রুতি, যা রাখা হবে না, সেটির অপেক্ষা না করে আমি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আমার কাছে মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সত্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সত্য যতই কষ্টদায়ক হোক, আমি চাই সত্যটাই আমাকে বলা হোক।

আসলে সংবাদ সম্মেলনের দিন সকালে পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ও কোচের সঙ্গে আমার যে কথোপকথন হয়েছিল, সেটি যাচাই করা যেতে পারে। আমি তাঁদের বলেছিলাম, তাঁরা যদি আমাকে না চান, তাহলে যেন সেটা আমাকে বলেন। শুধু আমার সঙ্গে সৎ থাকতে হবে। আমি সেটি মেনে নিতাম এবং তাঁদের কথা দিয়েছিলাম, আমরা চমৎকার কিছু প্রস্তুত করব, যেমনটা আমি আশা করি শেষ পর্যন্ত হবে। কেউ রাগও করত না।

আমার এখনো মনে আছে, যেন গতকালই ঘটেছিল। তাঁরা একসঙ্গে না বলেছিলেন। বলেছিলেন, জাতীয় দলেই আমার জায়গা।

প্রায় ২৫ বছরের ক্যারিয়ারে কোনো কোচ বা জাতীয় দলের কোনো কর্মকর্তার কোনো কারিগরি কিংবা কৌশলগত সিদ্ধান্তে আমি কখনো হস্তক্ষেপ করিনি। তাঁরা যা প্রস্তাব করেন, ভালো হোক বা খারাপ, আমি তা মেনে নিই। সিদ্ধান্তকে সম্মান করি। আর যখন তাঁরা আমার কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন, তখন আমার মনে হয়, এখানে আমার জায়গা নেই।

প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার জন্য আমি আমার জাতীয় দলের সতীর্থদের কাছেও ক্ষমা চাইছি। কারণ কোচের বিশ্বাসের প্রতি আমার সম্পূর্ণ ব্যত্যয় ঘটলেও, এসব কথোপকথনের সাক্ষী থাকা সবাই তা বলতে পারবেন, আমার এমনটা করা উচিত হয়নি। এর সম্পূর্ণ দায় আমার।

পর্তুগালের মানুষের কাছেও আবার ক্ষমা চাইছি। কিন্তু আমার কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বিষয়টি আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। আমার মনে হয়েছিল, সেই মুহূর্ত থেকে দলের সঙ্গে আমার থাকা শুধু দলের ক্ষতিই করবে। তাই আমি যা সব সময় বলে এসেছি, তা-ই করেছি। যদি মনে হয় আমি আর কোনো কাজে আসছি না, তাহলে ব্যাগ গুছিয়ে চলে যাব।

পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনকে আমার কাজের পরিণতি মূল্যায়ন করতে হবে এবং আমাকে শাস্তি দিতে হবে। আমি মনে করি, শাস্তি কমানো উচিত নয়। আমি শুধু একজন সাধারণ খেলোয়াড় নই। আমি দলের অধিনায়ক। এটি একটি বাড়তি দায়ের বিষয়। আমি ইতিমধ্যে ক্ষমা চেয়েছি। কিন্তু আমি জানি, কাজের পরিণতি আছে। ফুটবল দুনিয়ার যে কেউ, আমার মতোই জানেন, ব্যক্তির অবস্থান যা-ই হোক না কেন, সবার জন্য নিয়ম একই।

এ প্রসঙ্গে আমি বিদায়ী ম্যাচ নিয়ে অনেক কথা শুনেছি। বলা হচ্ছে, আমার উপযুক্ত একটি বিদায়ী ম্যাচ দরকার এবং ফেডারেশন আমাকে সেই সুযোগ দিতে চায়।

জীবনে যখন ক্ষুধায় কষ্ট করেছি, খাওয়ার মতো কিছুই ছিল না, তখন শিখেছি, কেউ কাউকে বিনা মূল্যে কিছু দেয় না। আমি আমার সব সমর্থককে, বিশেষ করে পর্তুগালের মানুষকে প্রতিশ্রুতি দিতে পারি, আমরা এক বা একাধিক বিদায়ী ম্যাচ খেলব। তার জন্য সময় থাকবে।

কিন্তু জাতীয় দলের কথা ভাবলে আমি আসলে প্রতিযোগিতার কথাই ভাবি। যেদিন আমার বাবার মৃত্যুর খবর পেয়েছিলাম, সেদিনও এটাই ভেবেছিলাম। আমি তখন জাতীয় দলের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে ছিলাম। পরদিনের ম্যাচ শেষ হওয়া পর্যন্ত সেখানেই থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। দেশের জন্য আমি এমন কিছু করেছিলাম, যা কোনো ক্লাবের জন্য কখনো করতাম না।

তাই আমি যদি শারীরিকভাবে সুস্থ থাকি, নিজের দলের হয়ে খেলি এবং গোল করার আশা রাখি, তাহলে আমার নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আমি জাতীয় দলের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও জয়ের জন্য আগের মতোই প্রস্তুত থাকব।

এটাই, বিশ্বাস করুন, পরম সত্য।

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো

৬ অক্টোবর ২০২৬’