সম্পর্কের বরফ কি তবে আর কখনোই গলবে না? বর্তমান পরিস্থিতি অন্তত তেমনটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এবারের ফিফা আন্তর্জাতিক বিরতিতে ফুটবল বিশ্বের সবচাইতে আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এবং পর্তুগাল কোচ জর্জ জেসুসের মধ্যকার চলমান দ্বন্দ্ব। এই লড়াইয়ে এখন আর জাতীয় দলের সঙ্গে থেকে লড়াই করতে আগ্রহী নন রোনালদো। পর্তুগালের সংবাদমাধ্যম ‘এ বোয়া’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, উয়েফা নেশনস লিগে পর্তুগালের শেষ ম্যাচের দিন অর্থাৎ রবিবারই সৌদি আরবে ফিরে যাচ্ছেন রোনালদো।

বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১২টা ৪৫ মিনিটে স্বাগতিক পর্তুগালের মুখোমুখি হবে নরওয়ে। ঠিক এই সময়েই রোনালদো রিয়াদে পৌঁছাবেন। সংবাদমাধ্যমটি আরও জানিয়েছে, মাদ্রিদ থেকে নিজের ব্যক্তিগত প্রাইভেট জেটে রিয়াদ উদ্দেশে রওনা দেবেন এই আল নাসর ফরোয়ার্ড। উল্লেখ্য, গত বুধবার কোপেনহেগেন থেকে পর্তুগাল দল ছেড়ে আসার সময়ও তিনি তাঁর প্রাইভেট জেট ব্যবহার করেছিলেন।

পর্তুগালের স্থানীয় সময় অনুযায়ী, ফ্লাইটটি দুপুর ১২টা বেজে ৫০ মিনিটে মাদ্রিদ থেকে ছেড়ে যাবে এবং সন্ধ্যা ৭টা বেজে ৪৪ মিনিটে রিয়াদে অবতরণ করবে। ঠিক যখন দ্রাগাও স্টেডিয়ামে জর্জ জেসুসের দল নরওয়ের বিপক্ষে মাঠে নামবে, রোনালদো তখন রিয়াদে পৌঁছাবেন।

রোনালদোর জাতীয় দল ছেড়ে চলে যাওয়ার কারণটি এখন আর গোপন নয়। এবারের আন্তর্জাতিক বিরতির প্রথম ম্যাচে ওয়েলসের বিপক্ষে একাদশে থাকলেও, পরের ম্যাচে নরওয়ের বিপক্ষে কোচ জেসুস তাঁকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখেন এবং পুরো ম্যাচ জুড়েই তাঁকে বদলি হিসেবে মাঠে নামাননি। এই ঘটনায় চরম ক্ষুব্ধ হয়ে পরবর্তীতে অনুশীলন করতে অস্বীকৃতি জানান রোনালদো।

পরবর্তীতে ডেনমার্কের বিপক্ষে ম্যাচের আগের দিন তিনি কোপেনহেগেন ত্যাগ করেন। পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি পেদ্রো প্রোয়েঙ্কার সঙ্গে আলোচনার পর রোনালদো নিজেই তাঁর ফেসবুক পোস্টে জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার কথা জানান। সেই পোস্টে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, সময়মতো তিনি এর কারণ ব্যাখ্যা করবেন।

কোচ জেসুসের সঙ্গে এই সংঘাতের পর রোনালদোর রিয়াদ যাত্রায় একটি বিশেষ ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। জাতীয় দলের অভ্যন্তরীণ সংকট সমাধানের চেয়ে আন্তর্জাতিক বিরতি শেষ করে দ্রুত আল নাসরের কার্যক্রমে যোগ দিতেই এখন বেশি মনোযোগী এই ৪১ বছর বয়সী কিংবদন্তি। প্রশ্ন উঠছে, পর্তুগালের জার্সির প্রতি তাঁর মায়া কি তবে ফুরিয়ে এল? পর্তুগিজ সংবাদমাধ্যম ‘রেকর্ড’ মনে করছে, এখনই কোনো সমঝোতায় না গিয়ে রোনালদো হয়তো এই বিরোধকে আগামী কয়েক সপ্তাহ টেনে নিতে চান।

জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার মুহূর্তে কোচ জেসুস এবং ফেডারেশনের সভাপতি তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করলেও তা ব্যর্থ হয়। রোনালদো চলে যাওয়ার পর তারা দুজনেই বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন, কিন্তু ততক্ষণে রোনালদো তাঁর প্রাইভেট জেটে চড়ে মাদ্রিদের উদ্দেশে রওনা হয়ে যান। যদিও জাতীয় দল থেকে তাঁর অবসরের বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, তবে বিভিন্ন সূত্র বলছে যে জেসুস বিরোধ মিটিয়ে রোনালদোর সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় বসতে আগ্রহী। তবে রোনালদো এখনো সেই আহ্বানে সাড়া দেননি।

এই দ্বন্দ্বের প্রভাব পড়েছে রোনালদোর ব্যক্তিগত জীবনেও। তাঁর ভক্ত এবং ফুটবল অঙ্গনের সাবেক ও বর্তমান তারকারা এই বিষয়ে বিভক্ত। রোনালদোর বড় বোন এলমা আভেইরো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে লিখেছেন, “জাতীয় দলের যেমন আরও ভালো কাঠামো প্রাপ্য ছিল, তেমনি সিআর সেভেনও আরও বেশি সম্মান পাওয়ার যোগ্য। আর পর্তুগিজ জনগণের কথা যদি বলেন, সত্যি বলতে তাদের কোনো কিছুতে সেরাটা পাওয়ার যোগ্যতা নেই। আমরা ঈর্ষাকাতর, অবজ্ঞাপূর্ণ এবং ক্রিস্টিয়ানো আসার আগে ফুটবলে আমাদের সেই চিরদিনের সাধারণত্বেই ফিরে যাওয়া উচিত।”

অন্যদিকে, রোনালদোর স্ত্রী জর্জিনা রদ্রিগেজ সরাসরি কোচ জেসুসের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। নিজের ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে তিনি লেখেন, “এই মানুষের নামের সঙ্গে কীভাবে “ক্রাইস্ট” (জেসুস) শব্দটি থাকতে পারে, আমি সেটাই বুঝতে পারছি না।”

একই পোস্টে জর্জিনা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কিংবদন্তি কোচ অ্যালেক্স ফার্গুসনের নামে ভুলভাবে একটি উক্তি ব্যবহার করে লিখেছিলেন, “জর্জ জেসুস যদি মনে মনে জেনেই থাকেন যে তিনি তাঁকে (রোনালদোকে) ব্যবহার করবেন না, তবে তাঁকে দলে ডাকলেন কেন? নিজের প্রভাব দেখানোর জন্য? এটা কর্তৃত্ব নয়, এটা নিরাপত্তাহীনতা।”

উল্লেখ্য, ২০০৩ সালে ফার্গুসনের হাত ধরেই রোনালদো ওল্ড ট্রাফোর্ডের ক্লাবে যোগ দিয়েছিলেন। তবে এই পোস্টটি ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়ে পরে মুছে ফেলেন জর্জিনা।