দেশের প্রতিটি শিশুর ভেতরেই কোনো না কোনো বিশেষ প্রতিভা লুকিয়ে থাকে, তাই তাদের সেই সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতি, সংগীত এবং বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের পথ প্রশস্ত করতে হবে বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আজ শিশু অধিকার দিবস-২০২৬ এবং বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির capacity-তে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এই মত প্রকাশ করেন। এবারের আয়োজনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘শিশুর ভবিষ্যৎ হোক সুরক্ষিত’।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিটি শিশুর মধ্যে কোনো না কোনো গুণ রয়েছে। আমাদের দরকার শুধু তাকে সেই সুযোগটি করে দেওয়া, যার মাধ্যমে সে নিজেকে বিকশিত করতে পারে।’
শিশুদের গুরুত্বারোপ করে তিনি আরও বলেন, ‘শিশুরা পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। শিশুরা সঠিকভাবে বেড়ে উঠলে পরিবারের পাশাপাশি দেশের ভিত্তিও শক্তিশালী হবে। আমাদের সব শিশুকে সঠিকভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দিতে পারলে আমাদের দেশের ভিত্তিটা অনেক মজবুত হবে।’
প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে, শিশুদের যথাযথভাবে গড়ে তুলতে পারলে তারা ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবে এবং একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রাখবে।
সরাসরি শিশুদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেবল পাঠ্যবইয়ের পড়াশোনায় ভালো হলেই চলবে না, বরং খেলাধুলা, শিল্প, সংস্কৃতি ও সংগীতের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রেও দক্ষতা অর্জন করতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমি তোমাদের আজ পড়ালেখার কথা বলব না। আমি বলব, তোমাদের খেলাধুলা করতে হবে।’
প্রতিটি শিশুর ভিন্ন ভিন্ন রুচি ও দক্ষতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কোনো শিশু ভালো ছবি আঁকতে পারে, কেউ কবিতা আবৃত্তি করতে পারে, কেউ গান বা বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পছন্দ করে, আবার কেউ নাচ কিংবা কোরআন তিলাওয়াতে পারদর্শী। প্রত্যেক শিশুকে তার পছন্দ ও আগ্রহ অনুযায়ী নিজেকে বিকশিত করার সুযোগ দিতে হবে।’
তারেক রহমান জানান, শিশুদের প্রতিভা বিকাশের পাশাপাশি খেলাধুলার প্রসারে সরকার বিশেষ উদ্যোগ নিচ্ছে। সম্প্রতি প্রাথমিক পর্যায়ে ছেলে ও মেয়েদের জন্য দেশব্যাপী ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায় থেকে প্রায় ২২ লাখ শিশু (১১ লাখ ছেলে ও ১১ লাখ মেয়ে) ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে।’ প্রধানমন্ত্রী আশা করেন, এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় তৈরি হবে।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শিশুদের সাংস্কৃতিক প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে ‘নতুন কুঁড়ি’ কর্মসূচি চালু করেছিলেন। বর্তমান সরকার সেই ঐতিহ্যের পাশাপাশি খেলাধুলার বিকাশে নতুন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার চায় প্রতিটি শিশু শিল্প, সংস্কৃতি, সংগীত ও খেলাধুলার ক্ষেত্রে অন্তত একটি বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাক।’ তিনি আরও জানান, ‘প্রত্যন্ত গ্রামের শিশুরাও যেন এসব সুযোগ পায়, সে জন্য স্কুল পর্যায় থেকেই আর্ট, কালচার, স্পোর্টস ও মিউজিকের সুযোগ সৃষ্টির চেষ্টা করছি।’
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি ইতিমধ্যে অনেকটা এগিয়েছে এবং ২০২৭ বা ২০২৮ সাল থেকে এটি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী জানান, প্রতিটি শিশুকে তার পছন্দ অনুযায়ী গান শেখা, বাদ্যযন্ত্র বাজানো কিংবা বিভিন্ন খেলাধুলার মধ্য থেকে একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
ভবিষ্যৎ কর্মজীবন ও উচ্চশিক্ষার কথা চিন্তা করে বিদেশি ভাষা শেখার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি আরবি, ম্যান্ডারিন, জার্মান ও জাপানিসহ বিভিন্ন বিদেশি ভাষা শেখার সুযোগ শিশুদের জন্য সৃষ্টি করা হবে। ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা কিংবা কর্মসংস্থানের জন্য যারা বিদেশে যাবে, তাদের জন্য একটি তৃতীয় ভাষা জানা অত্যন্ত সহায়ক হবে। এর মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক পরিসরে অন্য দেশের মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বাড়তি সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে।’
পাশাপাশি শিশুদের মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু শিক্ষা বা দক্ষতা দিয়ে একজন মানুষ সম্পূর্ণ হয় না, তার জন্য প্রয়োজন মানবিকতা। তিনি বলেন, ‘তোমাদেরকে মানবিক হতে হবে। এই দেশের প্রকৃতি, পশুপাখির প্রতিও তোমাদের মানবিক হতে হবে।’ শিশুদের গাছপালা ও পশুপাখির যত্ন নেওয়ার কথা বলে তিনি বলেন, একটি গাছকে শিশুর মতো যত্ন করে বড় করে তুলতে হবে এবং আশপাশের পশুপাখির প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে। তিনি মনে করেন, আমরা যদি প্রকৃতির প্রতি সদয় হই, তবে প্রকৃতিও আমাদের প্রতি সদয় হবে।
পরিবেশ পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে শিশুদের ভূমিকা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাস্তাঘাটে যত্রতত্র ময়লা ফেলার অভ্যাস বন্ধ করতে হবে। কোনো বড় মানুষকে ময়লা ফেলতে দেখলে বিনয়ের সাথে তাকে সতর্ক করতে তিনি শিশুদের আহ্বান জানান। শিশুদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তুমি ছোট হিসেবে তাঁকে বলতে পারো—ময়লাটি সঠিক জায়গায় ফেলুন। আপনি যদি পরিবেশ নষ্ট করেন, তাহলে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হব। আমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া মানে বাংলাদেশের লাখো-কোটি শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।’
অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সন্তানদের মধ্যে প্রকৃতি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের প্রতি ভালোবাসা এবং দায়িত্ববোধ তৈরি করতে হবে। তিনি মনে করেন, ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি পরিচ্ছন্ন, সুন্দর, মানবিক ও শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
বক্তব্য শেষে প্রধানমন্ত্রী শিশুদের পরিবেশনায় একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন এবং অংশগ্রহণকারী শিশুদের সঙ্গে কুশল বিনিময় ও ফটোসেশনে অংশ নেন। এই সময়ে তিনি শিশুদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন এবং তাদের আঁকা ছবি ও ফটো গ্যালারি পরিদর্শন করেন।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শিশু জাদুঘর ভবনে গিয়ে নিচতলায় সোলার প্যানেল ও সাব-স্টেশন উদ্বোধন করেন।
এর আগে সকালে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে পৌঁছালে ১৫০ জন শিশু তাঁকে বরণ করে নেয়। জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ডা. জুবাইদা রহমান।