শিশুদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনা ও মেধার সঠিক বিকাশের সুযোগ করে দিতে পারলে দেশের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) শিশু অধিকার দিবস ২০২৬ এবং বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই অভিমত ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “একটি পরিবারের ভিত্তি যেমন তার সন্তানদের সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার ওপর নির্ভর করে, তেমনি দেশের ভবিষ্যৎও নির্ভর করে শিশুদের সঠিক বিকাশের ওপর।”
অনুষ্ঠানের শুরুতেই শিশুদের প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, আজকের এই আয়োজনটি মূলত শিশুদের কেন্দ্র করেই। তাই বড়দের দীর্ঘ বক্তব্যের চেয়ে শিশুদের কথা শোনাই হওয়া উচিত এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য বলে তিনি মনে করেন।
নিজের শৈশবের স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ শিশু একাডেমির কার্যক্রম শুরুর শুরুর দিকের দিনগুলোতে তিনি নিজেও একজন খুদে অতিথি হিসেবে এখানে এসেছিলেন। তিনি আরও জানান, একসময় শিশু একাডেমির প্রকাশিত ‘শিশু’ ম্যাগাজিনে তার এবং তার ছোট ভাইয়ের লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত স্মারক বোর্ডে নিজের গল্প ও ভাইয়ের লেখা দেখে তিনি পুরোনো স্মৃতিতে ফিরে যাওয়ার কথা জানান।
শিশুদের কেবল পাঠ্যবইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতি এবং সংগীতচর্চার জন্য উন্মুক্ত সুযোগ সৃষ্টির আহ্বান জানান সরকারপ্রধান। শিশুদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “আমি তোমাদের কাছে পড়ার কথা বলব না। তোমাদের আজকে বলব তোমাদের খেলাধুলা করতে হবে।”
প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, প্রতিটি শিশুর মধ্যেই কোনো না কোনো বিশেষ গুণ বা প্রতিভা সুপ্ত থাকে। কেউ হয়তো ভালো ছবি আঁকে, কেউ আবৃত্তি করে, আবার কেউ গান-নাচ কিংবা বাদ্যযন্ত্র বাজাতে ভালোবাসে। নিজের কিবোর্ড ও গিটার শেখার সুপ্ত আগ্রহের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বাদ্যযন্ত্র, সংগীত, নাচ কিংবা কেরাত ও কোরআন তেলাওয়াত; যে যা পছন্দ করে, তা যেন মনোযোগ দিয়ে শিখি ও নিখুঁতভাবে রপ্ত করে।”
শিশুদের প্রতিভা বিকাশে সরকারের গৃহীত নানামুখী পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায় থেকেই খেলাধুলার জন্য বড় পরিসর তৈরি করা হচ্ছে। তিনি জানান, ইতোমধ্যে দেশে প্রথমবারের মতো প্রাথমিক পর্যায় থেকে ২২ লাখ শিশু (১১ লাখ ছেলে ও ১১ লাখ মেয়ে) ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছে। তার বিশ্বাস, এখান থেকেই ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় তৈরি হবে।
এ ছাড়া ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতার পাশাপাশি নতুন উদ্যমে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা শুরুর কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। সিলেট থেকে শুরু হয়ে ঢাকার আর্মি স্টেডিয়াম পর্যন্ত আয়োজিত এসব প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শিশুদের সংস্কৃতি ও খেলাধুলা—উভয় ক্ষেত্রেই সমান পারদর্শী করে তোলা হবে বলে তিনি জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে শহরের প্রতিটি শিশু যেন সমপরিমাণ সুযোগ পায়, সেজন্য সরকারি স্কুলে এসব সুবিধা যুক্ত করা হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে এবং ২০২৭ বা ২০২৮ সাল থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই তাদের পছন্দ অনুযায়ী গান, বাদ্যযন্ত্র বা খেলাধুলার বিষয় বেছে নিতে পারবে।
একই সঙ্গে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় দেশের শিশুদের এগিয়ে রাখতে অতিরিক্ত বিদেশি ভাষা শেখানোর পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা আরবি, ম্যান্ডারিন, জার্মান, জাপানিজসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ভাষার মধ্য থেকে যেকোনো একটি শেখার সুযোগ পাবে। এটি ভবিষ্যতে বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানে তাদের বাড়তি যোগ্যতা হিসেবে কাজ করবে।
সবকিছুর ঊর্ধ্বে শিশুদের ‘মানবিক মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলার তাগিদ দিয়ে তারেক রহমান বলেন, “তোমাদেরকে কিন্তু মানবিক হতে হবে। এই দেশের প্রকৃতি, এই দেশের পশুপাখির প্রতিও তোমাদের দরদী ও মানবিক হতে হবে।”
বাড়ি, বিদ্যালয় এবং আশপাশের গাছপালার যত্ন নেওয়া এবং পশুপাখির প্রতি সদয় আচরণ নিশ্চিত করে একটি সুন্দর ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান তিনি।