নির্বাচিত হওয়ার প্রায় এক বছর পর অবশেষে শপথ নিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) এক নির্বাচিত নেতা। আজ মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও চাকসুর সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ আল–ফোরকানের কাছে শপথ গ্রহণ করেন তিনি।
শপথ নেওয়া ওই নেতার নাম আকাশ দাস। তিনি চাকসু নির্বাচনে শিবির–সমর্থিত ‘সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেলের নির্বাহী সদস্য প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হয়েছিলেন। তবে জয়ের পর ধর্ষণ ও নারীদের কটূক্তির অভিযোগে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী শ্রীশান্ত রায়কে গ্রেপ্তারের ঘটনায় ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন আকাশ, যা পরবর্তীতে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।
ওই বিতর্কিত পোস্টের পর বিভিন্ন সংগঠনের তীব্র প্রতিবাদের মুখে আকাশ দাস শপথ গ্রহণ করেননি। গত বছরের ১৫ অক্টোবোর চাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ২৩ অক্টোবর অন্যান্য নির্বাচিত নেতারা শপথ নিলেও আকাশ দাস সেই অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত ছিলেন।
আকাশ দাসের শপথ গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উপাচার্য মোহাম্মদ আল–ফোরকান। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘বিতর্কের পর আকাশ দাস আত্মপক্ষ সমর্থন করে ক্ষমা চেয়েছেন। এ ছাড়া তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও তাঁকে নির্দোষ বলা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, চাকসুর মেয়াদের বাকি সময় আকাশ দাস চাকসুর কার্যক্রমে অংশ নেবেন।’
যেভাবে বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ সামনে আসায় আকাশ দাস তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে একটি পোস্ট করেন। গত বছরের ২২ অক্টোবর দেওয়া ওই পোস্টে তিনি ভুক্তভোগী নারীকেই ধর্ষণের ঘটনার জন্য দায়ী করেন। তবে তীব্র সমালোচনার মুখে এক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি পোস্টটি মুছে ফেলেন। পরবর্তীতে দুঃখ প্রকাশ করে অন্য একটি পোস্টে তিনি দাবি করেন, ঘটনা সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত জানতেন না।
আকাশের ওই পোস্টের প্রতিবাদে ২২ অক্টোবর রাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। চাকসুর নির্বাচিত অনেক নেতাও তাঁর বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানান। পরদিন ২৩ অক্টোবর চাকসু ও হল সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হলেও আকাশ দাস সেখানে উপস্থিত হননি। সে সময় তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেছিলেন, শপথ নিতে গেলে সংঘাতমূলক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, এ কারণে তিনি অনুষ্ঠানে যাননি।
শপথ গ্রহণের পর সমালোচনা
আকাশ দাসের এই শপথ গ্রহণ নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন চাকসুর ও শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আইয়ুবুর রহমান। তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হওয়ার যে নৈতিকতা থাকা দরকার, সেই জায়গা আকাশ দাস হারিয়েছেন। চাকসু নির্বাচনে আকাশ দাসকে ‘ট্রাম কার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। বিতর্কিত মন্তব্যের পর তাঁকে শিবির একপ্রকার দূরে সরিয়ে দেয়। এখন মেয়াদ শেষ হওয়ার সময়ে শপথ পড়িয়ে তাঁকে নিয়ে দায়মুক্তির চেষ্টা করা হচ্ছে।”
শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, বিতর্কিত পোস্ট দেওয়ার পরপরই আকাশ দাসের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। তাঁর মতে, তাঁকে শপথ পড়ানোর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরোক্ষভাবে ধর্ষণের পক্ষে অবস্থান নেওয়াকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি আরও বলেন, চাকসু শিক্ষার্থীদের, বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করার একটি প্রতিনিধিত্বশীল প্ল্যাটফর্ম। ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের বিষয়ে বিতর্কিত অবস্থান নেওয়া একজন ব্যক্তি কীভাবে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করবেন, সেই প্রশ্নটি রয়ে গেছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক সুমাইয়া শিকদার বলেন, আকাশ দাস ইসলামী ছাত্রশিবিরের সমর্থিত প্যানেল থেকে নির্বাচন করেছিলেন। ছাত্রশিবির যে আকাশ দাসের চিন্তাভাবনাকে সমর্থন করছে, আজ তাঁর শপথ গ্রহণের মাধ্যমে সেটিরই প্রমাণ পাওয়া গেল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চাকসুর সাধারণ সম্পাদক সাঈদ বিন হাবিব বলেন, ‘চাকসুর মেয়াদ শেষ হতে এখন প্রায় এক মাসের মতো বাকি। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী মূল কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য গঠনতন্ত্রের প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দেবেন এবং সে অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালিত হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত করে ইতিবাচক প্রতিবেদন দিলে আকাশ দাসকে নিয়ে কাজ করতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।’
তবে আকাশ দাসের কাছ থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতা নেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন চাকসুর ছাত্রী কল্যাণবিষয়ক সম্পাদক নাহিমা আক্তার। তিনি বলেন, ‘আগের পোস্টের কারণে আকাশ দাসকে শপথ নিতে দেওয়া হয়নি। চাকসুর মেয়াদও শেষের দিকে। এ সময়ে তাঁর শপথ নেওয়াটা আমার কাছে যৌক্তিক মনে হয়নি। কার্যনির্বাহী সদস্যরা বিভিন্ন সম্পাদককে কাজে সহযোগিতা করেন। তবে ছাত্রী বিষয়ে তাঁর কোনো রকম সহযোগিতা আমরা নেব না।’