নারী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও দিল্লি পুলিশের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যদিও ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে পড়ে দিল্লি সরকার বর্তমানে সেই পদোন্নতির নির্দেশ স্থগিত রেখেছে। এই পুরো ঘটনাটি সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর বিস্ময় ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট শুরু হয় ২ অক্টোবর থেকে, যখন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এসআইআর প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে বিরোধীরা টানা বিক্ষোভ শুরু করেন। প্রতিদিন যন্তর মন্তর অভিমুখে মিছিল করার চেষ্টা করছেন আন্দোলনকারীরা, যার ফলে পুলিশের সঙ্গে তাঁদের দফায় দফায় ধস্তাধস্তিও হয়ে যাচ্ছে।
গত শনিবার এই বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনরত তিন নারী সাংবাদিক কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ আনেন। অভিযুক্তদের মধ্যে অন্যতম হলেন দিল্লির পুলিশের সহকারী (অ্যাসিস্ট্যান্ট) কমিশনার (এসিপি) বিবেক ভগত।
বিতর্কের সূত্রপাত হয় গত সোমবার, যখন দিল্লি পুলিশের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় যে, আরও ১১ জনের পাশাপাশি বিবেক ভগতকেও পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে তিনি সহকারী কমিশনার পদ থেকে পদোন্নতি পেয়ে ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) হতে চলেছিলেন।
ভুক্তভোগী তিন নারী সাংবাদিক অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে থানায় এফআইআর দায়ের করার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। পুলিশ তাঁদের জানায়, অপরাধ শাখা বর্তমানে অভিযোগের সত্যতা খতিয়ে দেখছে। পুলিশের দাবি, অপরাধ শাখা আগে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করবে, তারপর এফআইআরের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। তবে প্রচলিত আইন অনুযায়ী, নারীদের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ পাওয়া মাত্রই এফআইআর করা বাধ্যতামূলক। এই আইনি বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও বিবেক ভগতের পদোন্নতির বিষয়টি নানা প্রশ্ন তুলেছে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে সোমবার গভীর রাতে (মঙ্গলবার ভোরে) দিল্লি সরকারের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ একটি বার্তা দেওয়া হয়। সেখানে স্পষ্টভাবে জানানো হয়, বিবেক ভগতের পদোন্নতির নির্দেশটি আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।
সরকারি বার্তার তথ্যানুযায়ী, ১২ জন পুলিশ কর্মকর্তার পদোন্নতির সিদ্ধান্তটি বিক্ষোভের ঘটনার অনেক আগে, গত ২৫ সেপ্টেম্বর নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে ৫ অক্টোবর সেই নির্দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে জারি করা হয়। তবে বিবেক ভগত নিজেই এই পদোন্নতি গ্রহণে রাজি হননি বলে জানানো হয়েছে।
ভগত কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন যে, নারী সাংবাদিকদের যৌন হেনস্তার যে অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে আনা হয়েছে, তার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তিনি পদোন্নতি গ্রহণ করতে ইচ্ছুক নন। তাঁর এই ইচ্ছার কথা জানিয়ে অনুরোধ করা হয় যেন তাঁকে বাদ দিয়ে বাকিদের পদোন্নতির বিষয়টি নতুনভাবে জানানো হয়।
গত সোমবার পদোন্নতির খবরটি সামনে আসার পর বিক্ষোভকারীদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। থানার সামনে যারা বিক্ষোভ প্রদর্শন করছিলেন, তাঁদের সঙ্গে হেনস্তার অভিযোগ আনা এক নারী সাংবাদিককেও পুলিশ আটক করে। যদিও পরবর্তীতে তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়।
ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) পক্ষ থেকে পুলিশের এই আচরণের তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। সিজেপি নেতা সৌরভ দাসের অভিযোগ, আইনজীবীর সহায়তায় অভিযোগকারী নারী সাংবাদিকেরা পুলিশের সঙ্গে দেখা করতে চাইলেও দিল্লি পুলিশ তাঁদের এড়িয়ে চলছে।
সিপিএম নেত্রী বৃন্দা কারাতকে সঙ্গে নিয়ে পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় বিবেক ভগতের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করতে যান সৌরভ দাস। তাঁর অভিযোগ, তা সত্ত্বেও পুলিশ এফআইআর গ্রহণ করেনি। সিজেপির দাবি, দিল্লি পুলিশ নিজেদের কর্মীদের বাঁচাতে চাইছে।
পুলিশি আচরণের কড়া সমালোচনা করেছেন সিজেপি নেত্রী রত্না সিংও। তিনি বলেন, “পুলিশ তো এফআইআর নিচ্ছে না, উল্টো অভিযোগকারী নারীদের বিরুদ্ধে এফআইআর দাখিল করছে। তাঁদের আটক করছে। মুঠোফোন বাজেয়াপ্ত করতে চাইছে। এটা অত্যন্ত বিরক্তিকর। নারীরা থানার বাইরে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করছেন। এসিপির বিরুদ্ধে অভিযোগ নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন। অথচ সেদিকে নজর না দিয়ে পুলিশ অভিযোগকারী নারীদের হয়রানি করছে।”
রত্না সিং আরও বলেন, “পুলিশ বলছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের হেনস্তা করার যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তা নাকি ভিত্তিহীন। অসত্য।”
এই ঘটনার প্রতিবাদে সিজেপি ঘোষণা করেছে যে, আগামী ১০ অক্টোবর তারা ‘যন্তর মন্তর ২.০’ আন্দোলন শুরু করবে। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের যেখানে বাধা দেবে, সেই স্থানটিই হয়ে উঠবে যন্তর মন্তর ২.০।
পুলিশের এই আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও। তিনি বলেন, “দিল্লি পুলিশ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে। অতএব নারী সাংবাদিকদের যৌন হেনস্তা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর মুখ খোলা উচিত। তবে সবার আগে উচিত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মীদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা।”