‘যা আছে, তার জন্য কৃতজ্ঞ থাকুন’—এই অতি পরিচিত ও সহজ পরামর্শটি আমরা অনেকেই বিভিন্ন সময়ে শুনে থাকি। তবে এই অভ্যাসের পেছনে কেবল মানসিক প্রশান্তির বিষয়টিই কাজ করে না। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মানসিকতার সঙ্গে আমাদের স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাসের একটি গভীর যোগসূত্র রয়েছে।
দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট ইতিবাচক দিকগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকার মানসিকতা একজন মানুষকে তার খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর খাবার নির্বাচন, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং মানসিক চাপ মোকাবিলায় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। যেহেতু এই অভ্যাসগুলো দীর্ঘজীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত, তাই পরোক্ষভাবে বলা যায় যে কৃতজ্ঞতার চর্চা আমাদের দীর্ঘায়ু হতে সাহায্য করে।
সম্প্রতি ‘ব্রিটিশ জার্নাল অব হেলথ সাইকোলজি’তে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ২৪টি ভিন্ন ভিন্ন গবেষণার তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই বিশাল তথ্যভাণ্ডারে মোট ৬ হাজার ৯৬৭ জন ব্যক্তির তথ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল। অংশগ্রহণকারীদের তালিকায় ছিলেন শিক্ষার্থী, সাধারণ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, যেসব ব্যক্তির মধ্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রবণতা বেশি, তাদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করার ঝোঁকও তুলনামূলকভাবে বেশি। এর মধ্যে প্রধানত স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত বিশ্রাম বা ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের মতো ইতিবাচক অভ্যাসগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে গবেষকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, এর অর্থ এই নয় যে কেবল কৃতজ্ঞ থাকলেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুস্থ হয়ে যাবেন। এই গবেষণাটি মূলত কৃতজ্ঞতা এবং স্বাস্থ্যকর আচরণের মধ্যে একটি ইতিবাচক সম্পর্ক প্রদর্শন করেছে, তবে এটি সরাসরি কারণ ও ফলের সম্পর্ক প্রমাণ করেনি।
গবেষকদের ধারণা অনুযায়ী, কৃতজ্ঞতা মানুষের মনোযোগকে ‘কী নেই’ এই অভাববোধ থেকে সরিয়ে ‘কী আছে’—সেই প্রাপ্তির দিকে ফেরাতে সক্ষম। এর ফলে ইতিবাচক অনুভূতি বৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষ ভবিষ্যৎ জীবন সম্পর্কে আরও সচেতন হয়ে ওঠে। তারা নিজেদের প্রাপ্ত সম্পদের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করার চেষ্টা করেন এবং এর উপযোগিতা বাড়ান। ফলস্বরূপ, নিজের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়।
অর্থাৎ, প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর খাবার বেছে নেওয়া, কিছুক্ষণ হাঁটাচলা করা, নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া কিংবা অতিরিক্ত মানসিক চাপের মুহূর্তে নিজেকে কিছুটা বিরতি দেওয়া—এই ছোট ছোট সিদ্ধান্তের পেছনে নিজের জীবন ও শরীরের প্রতি এক ধরনের গভীর মূল্যবোধ কাজ করে।
এছাড়া, কৃতজ্ঞ মানুষগুলো সাধারণত ইতিবাচক মানসিকতার অধিকারী হয়ে থাকেন। তারা অন্যের ভালো দিকগুলো মনে রাখেন এবং খুব সহজেই ক্ষমা করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য এই গুণগুলো অত্যন্ত উপযোগী অনুশীলন হিসেবে বিবেচিত হয়।
কৃতজ্ঞতার এই চর্চার জন্য খুব বড় কোনো আয়োজন বা প্রস্তুতির প্রয়োজন নেই। একটি ছোট্ট ‘ধন্যবাদ’ শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অসীম ক্ষমতা। প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে দিনের এমন তিনটি বিষয়ের কথা লিখে রাখতে পারেন, যেগুলোর জন্য আপনি কৃতজ্ঞ। এটি হতে পারে পরিবারের সদস্যদের ভালোবাসা, সুস্থ শরীর, একটি শান্ত সকাল কিংবা প্রিয় কোনো মানুষের সঙ্গে কয়েক মিনিটের সংক্ষিপ্ত কথোপকথন। কৃতজ্ঞতা হয়তো কোনো ‘জাদুর ওষুধ’ নয়, আবার ‘জাদুর ওষুধ’ও বটে!