লিওনেল মেসির জন্য আর কোনো স্টেডিয়াম সম্ভবত এতটা ভালোবাসার জায়গা হয়ে ওঠেনি যতটা মনুমেন্তাল। এই মাঠেই আকাশি-সাদা জার্সিতে শেষবারের মতো দেখা দেবেন ফুটবল জাদুকর মেসি। মনুমেন্তাল এবং মেসির মধ্যকার এই ভালোবাসার বন্ধনটি এতটাই গভীর যে তার সঠিক ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া কঠিন। ঠিক যেমনটা হয় না মেসিকে বল পায়ে দেখলেই ফুটবলপ্রেমীদের বুকের ভেতর বয়ে চলা উত্তেজনার ঝড়ের ব্যাখ্যা।
আগামী বুধবার বাংলাদেশ সময় ভোরে রিভার প্লেটের এই মাঠে শেষবারের মতো দেখা যাবে সেই আকাশি-সাদা ঝড়। তবে শেষ বাঁশি বাজার পর যখন সেই ঝড় থেমে যাবে, তখন কি মনুমেন্তালের প্রাণ জুড়াবে? না, ভালোবাসার সাধ যে কখনো মেটে না।
একটি কংক্রিটের স্থাপনার সঙ্গে মেসির এই অনন্য সম্পর্কের কথা এক বাক্যেই বুঝিয়ে বলা যায়—আর্জেন্টিনায় রিভার প্লেটের এই স্টেডিয়ামে মেসির গোলসংখ্যা (১৯) সবচেয়ে বেশি। মনুমেন্তাল তাঁকে দুহাত ভরে দিয়েছে। এখন বিদায়বেলায় প্রাণহীন সেই কংক্রিটের স্থাপনাকে মেসির কিছু ফিরিয়ে দিতেই হবে। স্টেডিয়ামটি যদি কথা বলতে পারত, তবে হয়তো বলে উঠত, “কিছুই চাই না আমার গোল ছাড়া!”
গত বছরের সেপ্টেম্বরে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ভেনেজুয়েলা ম্যাচে মনুমেন্তালে সর্বশেষ খেলেছিলেন মেসি। আর্জেন্টিনার ৩–০ গোলের জয়ে তাঁর অবদান ছিল দুটি গোল। ২১ বছরের দীর্ঘ আকাশি-সাদা ক্যারিয়ারে আর্জেন্টিনার অন্যান্য স্টেডিয়ামে মেসি কখনো কখনো সংকট কিংবা বিতর্কের সম্মুখীন হয়েছেন; কিন্তু জাতীয় দলের এই ঘরের মাঠে তাঁর স্মৃতিগুলো শুধুই সুখের।
আর্জেন্টিনার এই বৃহত্তম স্টেডিয়ামে জাতীয় দলের হয়ে মেসি কখনো হারেননি। ২৮টি ম্যাচে তাঁর রেকর্ড ২২ জয় এবং ৬ ড্র। এখানে তিনি করেছেন ১০ গোল, যার ফলে ম্যাচপ্রতি তাঁর গোল করার গড় ০.৬৭। বিদায়ী ম্যাচে ৮৫ হাজার আসনের মনুমেন্তালের নিশ্চয়ই কোনো বিশেষ চাওয়া থাকবে। সেটি হতে পারে এমন—জাতীয় দলে মেসির ক্যারিয়ার যেহেতু ২১ বছরের, তাই বিদায়ী ম্যাচে তিনি যদি দুটি গোল করেন, তবে মনুমেন্তালে তাঁর গোলসংখ্যা সেই সময়ের সমার্থক হয়ে উঠবে।
স্মৃতির পাতায় ফিরলে দেখা যায়, এই অক্টোবরেই ২০০৫ সালের ৫ অক্টোবর ২০০৬ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে পেরুর বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ২–০ গোলের জয়ের ম্যাচটি ছিল মনুমেন্তালে জাতীয় দলে মেসির প্রথম ম্যাচ। গোল না পেলেও কোচ হোসে পেকারম্যানের অধীনে দুর্দান্ত খেলেছিলেন তিনি। তখন মাত্র ১৮ বছর বয়সী মেসি পেরুর কাছ থেকে পেনাল্টি আদায় করেছিলেন। স্পটকিক থেকে গোলটি করেন হোয়ান রোমান রিকেলমে এবং অন্য গোলটি ছিল আত্মঘাতী।
আবার এই অক্টোবরেই ২০০৮ সালের ১১ অক্টোবর ২০১০ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ছিল উরুগুয়ে। জয়খরায় ভোগা আলফি বাসিলের আর্জেন্টিনার হয়ে মাত্র ৫ মিনিটে হেডে গোল করেছিলেন মেসি। মনুমেন্তালে সেটাই ছিল তাঁর প্রথমবার জাল স্পর্শ করার স্বাদ। ওই ম্যাচে অন্য গোলটি করেছিলেন সের্হিও আগুয়েরো।
২০১২ সালের ২ জুন মনুমেন্তাল প্রথমবার সত্যিকারের মেসি-আলো দেখেছিল। ২০১৪ বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচে ইকুয়েডরকে ৪–০ গোলে হারায় আলেহান্দ্রো সাবেয়ার আর্জেন্টিনা। সেই চারটি গোলেই অবদান ছিল মেসির। প্রথমে তিনি আগুয়েরোর গোলটির সুযোগ তৈরি করেন, এরপর গঞ্জালো হিগুয়েনকে দিয়ে গোল করান। নিজেও একটি গোল করেন এবং শেষ গোলটি করান আনহেল দি মারিয়াকে দিয়ে।
২০১৭ সালে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে চিলির বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করে আর্জেন্টিনাকে জেতান মেসি। সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনা দলে শুধু মেসিই চিলির মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ান। পেনাল্টি থেকে গোল করে দলের জয় নিশ্চিত করেন তিনি, যার ফলে পয়েন্ট তালিকায় আবারও লড়াইয়ে ফিরেছিল আর্জেন্টিনা।
২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কোভিড মহামারির পর আর্জেন্টাইনরা প্রথম এই স্টেডিয়ামে ফেরার সুযোগ পান। ব্রাজিলে কোপা আমেরিকা জয়ের পর ঘরের মাঠে সেটি ছিল আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচ। মাত্র ৩০ শতাংশ দর্শক প্রবেশের অনুমতি থাকলেও সেদিন মেসির অসাধারণ খেলাটি নিশ্চয়ই অনেকের মনে গেঁথে আছে। বলিভিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩–০ গোলের জয়ে সবকটি গোলই ছিল মেসির। সেই ম্যাচেই দক্ষিণ আমেরিকান জাতীয় দলের হয়ে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে পেলের রেকর্ড ভেঙে দেন মেসি। ৭৯ গোল করে ছাড়িয়ে যান ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তিকে।
কাতার থেকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফেরা আর্জেন্টিনাকে বরণ করে নিতে ২০২৩ সালের ২৩ মার্চ সেজেছিল মনুমেন্তাল স্টেডিয়াম। সেই আয়োজনের মধ্যমণি ছিলেন মেসি। পানামার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে ২–০ গোলের জয়ে ফ্রি-কিক থেকে একটি গোল করেন তিনি। আর্জেন্টিনার জার্সিতে তা ছিল মেসির ৯৯তম ম্যাচ এবং ক্যারিয়ারের ৮০০তম ম্যাচ। ম্যাচ শেষে দর্শকদের সঙ্গে বিশ্বকাপ জয় উদ্যাপন করেন মেসি।
সবশেষে ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ভেনেজুয়েলার মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা। দেশের মাটিতে সেটাই ছিল মেসির সর্বশেষ অফিশিয়াল ম্যাচ। জোড়া গোল করে আর্জেন্টিনাকে ৩–০ গোলে জেতান মেসি।