সরকারি সেবার ক্ষেত্রে বিদ্যমান পুরোনো ও দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে কেবল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) যুক্ত করলে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন সম্ভব হবে না। এআই ব্যবহারের আগে প্রয়োজন সামগ্রিক সিস্টেম সংস্কার, স্থানীয় ও মানসম্মত তথ্যের নিশ্চয়তা এবং তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কার্যকর ব্যবস্থা। এছাড়া এআই কোন উদ্দেশ্যে এবং কীভাবে ব্যবহৃত হবে, সেই প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

আজ সোমবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬’-এর শেষ দিনের এক বিশেষ অধিবেশনে বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞগণ এই মত ব্যক্ত করেন। উক্ত অধিবেশনটির শিরোনাম ছিল ‘ক্যান অ্যালগরিদমস বিল্ড ট্রাস্ট? রিথিংকিং স্টেট ক্যাপাসিটি ইন দ্য এজ অব এআই’।

অধিবেশনে অ্যাকাউন্টেবিলিটি ল্যাব পাকিস্তানের নির্বাহী পরিচালক ফাইয়াজ ইয়াসিন উল্লেখ করেন যে, সরকার এবং জনগণের মধ্যে আগে থেকেই আস্থার এক বিশাল ঘাটতি বিদ্যমান। এই পরিস্থিতিতে এআই কি সমস্যা সমাধানের গতি ত্বরান্বিত করবে, নাকি আগামী ১০-১৫ বছর সমস্যা সমাধান না করার একটি নতুন অজুহাত হয়ে দাঁড়াবে—সেই প্রশ্নটি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, “এআই ব্যবহারের আগে সরকারকে বুঝতে হবে, তারা এই প্রযুক্তির কাছ থেকে কী চায়। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা, আমলাতন্ত্র ও সাধারণ মানুষকেও এআই ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করতে হবে।”

পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতির উদাহরণ টেনে ফাইয়াজ ইয়াসিন জানান, সেখানে এখনো অধিকাংশ সরকারি সিদ্ধান্ত তথ্যভিত্তিক নয়। অথচ এআই-কে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে প্রথমেই পর্যাপ্ত ও মানসম্মত তথ্যের প্রয়োজন।

সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্স বাংলাদেশের পরিচালক শেখ মোহাম্মদ দানিয়াল তাঁর বক্তব্যে বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত ডিজিটাল ব্যবস্থা তৈরি করলেও কোনো লাভ হবে না, যদি সেই ব্যবস্থার পেছনের মূল সিস্টেম বা কাঠামো পরিবর্তন করা না হয়। সরকারি সেবার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “সরকারি সেবায় প্রচলিত ব্যবস্থায় ফাইল এগিয়ে নিতে ঘুষ দেওয়ার সুযোগ থাকলে ডিজিটাল ব্যবস্থা করেও মানুষের আস্থা তৈরি করা যাবে না।”

এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্থানীয় বাস্তবতা এবং তথ্যের গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন অর্থনীতিবিদ ও এআই গবেষক শিমেলসে মেকোনেন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র বা চীনে তৈরি এআই মডেল অন্য দেশে ব্যবহার করা সম্ভব হলেও সেটিকে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে নিতে হবে। মডেলটি যে তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রশিক্ষিত, সেই তথ্য বর্তমান স্থানীয় পরিস্থিতিকে সঠিকভাবে প্রতিফলিত করছে কি না, তা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। এআই-এর ভুল করার ঝুঁকি বিবেচনা করে তিনি শুরুতে তুলনামূলক কম ঝুঁকির সরকারি সেবাগুলোতে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দেন।

সোলশেয়ারের প্রধান নির্বাহী ও সহপ্রতিষ্ঠাতা সেবাস্তিয়ান গ্রোহ মনে করেন, মানুষকে সম্পৃক্ত না করে কেবল অ্যালগরিদমের ওপর আস্থা তৈরি করা কঠিন। তিনি বলেন, “যাদের জন্য অ্যালগরিদম কাজ করবে, সেটি তৈরির সময় তাদের তথ্য ও মতামত নিতে হবে। প্রযুক্তি কীভাবে মানুষের কাজে লাগছে, সেটি তাদের বুঝতে দিতে হবে। অ্যালগরিদমের সিদ্ধান্তে সমস্যা হলে অভিযোগ বা প্রতিকারের সুযোগও রাখতে হবে।” মানুষের কাছে প্রযুক্তির উপকারিতা দৃশ্যমান না হলে শুধু প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে আস্থা তৈরি হবে না বলে তিনি মনে করেন।

অ্যাকাউন্টেবিলিটি ল্যাব নেপালের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক পরিচালক নারায়ণ অধিকারী মন্তব্য করেন যে, প্রযুক্তি ব্যবহারে শুধু নতুন ব্যবস্থা তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। তাঁর মতে, প্রযুক্তি মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে পারছে কি না, সেটিই আসল বিষয়। আস্থা তৈরির জন্য কেবল ‘মেশিন মাইন্ডসেট’ দিয়ে কাজ না করে মানুষ, প্রতিষ্ঠান এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

অ্যালগরিদম কীভাবে মানুষের মতামত এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে প্রভাবিত করতে পারে, সেই বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। সিটি ইউনিভার্সিটি অব হংকংয়ের সহযোগী অধ্যাপক মার্কো স্কোরিক বলেন, অ্যালগরিদমের অতিরিক্ত বাছাই প্রক্রিয়ার কারণে মানুষ একই ধরনের বিষয় বারবার দেখতে থাকে। ফলে ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ কমে যায়। এভাবে মানুষ ক্রমে ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে কথা বলতেও অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। এতে সামাজিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট আরও বাড়তে পারে।

এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্যের অপব্যবহারের ঝুঁকির কথা বলেন ভারতের স্টারকার গ্লোবাল সলিউশন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জে পি সিং। তিনি বলেন, “ভালো উদ্দেশ্যে তৈরি করা কোনো প্রযুক্তি পরে নজরদারি বা অন্য কাজে ব্যবহার হতে পারে।” ভারতে শহরের নিরাপত্তার জন্য স্থাপন করা সিসিটিভি ক্যামেরার উদাহরণ টেনে তিনি জানান, একটি শহরে বিক্ষোভের সময় ওই ব্যবস্থার মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। অথচ শুরুতে ব্যবস্থাটি তৈরির উদ্দেশ্য ছিল চুরি বা দুর্যোগের মতো ঘটনা মোকাবিলা করা।

পুরো অধিবেশনটি পরিচালনা করেন শপ আপ বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট মামুন রশীদ। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য প্রদান করেন ভারতীয় নীতি পরামর্শক সুবিমল ভট্টাচার্য।