কবিতার পাতায় ফুটে উঠেছে এক অদ্ভুত বিষণ্নতা আর ভালোবাসার টান। কাজল শাহনেওয়াজের লেখনীতে ধরা পড়েছে জীবনের নানা ধূসর রং, যেখানে প্রেম যেমন আছে, তেমনি আছে নিঃসঙ্গতা আর মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকার আর্তনাদ। তাঁর কবিতার প্রতিটি পঙ্ক্তিতে মিশে আছে এক গভীর সংবেদনশীলতা।
একটি কবিতায় দেখা যায়, প্রিয়তমার স্মৃতি আর বৃষ্টির এক অদ্ভুত মেলবন্ধন। কবি লিখেছেন, "তুমি গানটা শুনছ এই বিষণ্ন লাইনটার জন্যই তুমি শুনছ। আবার তাল দিচ্ছ ভালো কোন সংবেদের আশায়। দিনটাও ছিল গান শোনার। তখন সে কাচ সরায়ে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ছিল। ঘন কালো মেঘ থেকে বৃষ্টি নামতে দেখল। বড় বড় ফোঁটায় ফোঁটাদের কত কথা, কত ভাবনা। বৃষ্টি কেন বড় হয়ে ছোট হয়, তারপর ধীরে ধীরে চলে যায়?"
স্মৃতির এই ভিড়ে কবি যেন নিজেকেই হারিয়ে ফেলছেন। তিনি অনুভব করছেন, "তাতে তো তুমিও ঢুকে যাবে, সমস্যা হবে মিহিন ধারায় তোমারে চোখেই পড়বে না। তুমি কি আছ নাকি নাই!"
সময়ের সাথে সাথে সম্পর্কের পরিবর্তন আর অস্তিত্বের সংকট ফুটে উঠেছে তাঁর ভাষায়। তিনি বলেন, "তোমার থাকা না–থাকাটা খুব নিয়মিত হয়ে গেছে। সময়টা সরু হয়ে গেছে...কত দিন মনটা বেঁচে থাকে কে জানে। তুমি যদি একরকম আশার কথা বলো, তাহলে যে ফিরে আসবে একদিন সৎপিতার সাথে। বৃষ্টির সাথে দেখা হলে জানাবে তত দিন আমি পেছনে তাকাব না কোনো অপেক্ষায়।"
জীবনের ক্লান্তি আর বিস্মৃতি নিয়ে কবি আক্ষেপ করে লিখেছেন, "জীবন এতই ছড়ায়ে গেল যে এখন প্রায় ভুলে যাই নিজের নাম। তোমার নামও আর ভেসে ওঠে না, শুধু আরও অনেক কিছু ভুলে যাবার কথা মনে হয়।"
ভালোবাসার এক অনন্য রূপরেখা এঁকে কবি বলেন, "তোমার মতোই ভাবতাম, জীবন একটা আর্ট হয়ে উঠবে। হৃদয়ের কোনো এক অন্দর থেকে আনন্দ উদিত হবে। তুমি যেভাবে ভালোবাসতে চেয়ে আমারে ধরে উঠতে চাইছিলে, কিন্তু তা ছিল তোমার ভেতরই ভুলে যাওয়া একটা অবর্তমানতা।"
প্রকৃতির সাথে প্রেমের এই মিশেল আরও গভীর হয় যখন তিনি লেখেন, "তোমার বাগানে ফুল ফুটে উঠতে চেয়েছিল। ফুলগুলি সুশৃঙ্খল হয়ে সূর্যের দিকে হাসি ছুড়ে দিয়ে আলো ধরতে চেয়েছিল আর শিশির থেকে গলা ভেজাতে চেয়েছিল কিছু কুয়াশামতো আনন্দে।"
মনের শূন্যতা আর প্রিয়তমার উপস্থিতির কথা স্মরণ করে কবি বলেন, "আমার মনের ভিতরের শূন্যতা আলো স্পর্শ করতে চাইছিল, তা তোমার মধ্যে ছিল ভরে দেবার ভলিউম। তোমার হালকা সোনালি সোনালি চুলে খেলা করত আনন্দ। তা থেকে একদিন কিছু চুল উড়িয়ে দিলে জানালার ওপাড়ে, তোমার আনন্দ কিছু উড়ে গেলে পাশের অরণ্যে পাখিদের পাড়াতে।"
তৃষ্ণার্ত হৃদয়ে সেই স্মৃতিগুলোই যেন একমাত্র আশ্রয়। কবি লিখেছেন, "আমি তৃষ্ণায় ডুবতে ডুবতে উড়ে যাওয়া চুলের অরণ্যে তোমারে দেখি। তা থেকে কিছু পাই কিনা তা ভাবছিলাম সেদিন আমিও উড়ে যেতে যেতে। উড়ে যেতে পারতাম আমিও সেদিন।"
হাসপাতালের নিঃসঙ্গতা আর মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্তগুলো অত্যন্ত করুণভাবে ফুটে উঠেছে তাঁর কবিতায়। সেখানে তিনি স্বীকার করেন, "ভালোবাসি তাই বশ্যতা স্বীকার করতে দ্বিধা নাই।"
রোগশয্যায় শুয়ে এক্স-রে প্লেটের দিকে তাকিয়ে কবি অনুভব করেন তাঁর শেষ মুহূর্তের ছবি। তিনি বলেন, "হাসপাতাল ছাড়ার আগেই মহাশূন্যের চিত্রময় সর্বশেষ ছবিটা প্রকাশ পেল—এক্স–রে প্লেটে ফুটে উঠেছে। তখন আমি ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারছি না। তুমি মন খারাপ করে জেমস ওয়েবে চোখ পেতে ছিলে আর ভাবছিলে, আমি কি আর দম ফিরে পাব না?"
শহুরে জীবনের যান্ত্রিকতা আর গ্রামের সরলতার মাঝে কবি নিজেকে খুঁজে পান এক অদ্ভুত শূন্যতায়। তিনি লিখেছেন, "মহানগরে উল্লসিত রং তুমি যেন গ্রামে বসে মৃত্যুকে লাল রঙের জাল ফেলতে দেখছ। আমি এর মাঝখানে পড়ে আছি হাসপাতালে। আমি ছিলাম কবি, কিন্তু আজ আমার কোনো বন্ধু নাই। আমি বহু দিন ধরে একা। শৈশব থেকে বন্ধুত্বের বড়শি ফেলে বসে আছি। অনেক নির্জন উপকূলে নায়িকার রূপ দেখে কেটে গেছে বেলা।"
শারীরিক অসুস্থতা আর মানসিক যন্ত্রণার কথা বলতে গিয়ে কবি বলেন, "আজ আমার দুই ফুসফুস আক্রান্ত হয়ে আছে। আজ আমার ক্লান্ত হৃদয়ে মৌসুমি হাওয়ার অভাব। কালের গালে একটা চুমু দিতে তৎপর সর্বদা শুধু বেদিশা। হাসপাতালে কেন গো আল্লা কিছু ঘাস পাঠালে। এ ধরণিতে আজ সকালে একটা ইন্দুর কাটে কুটকুট পরমায়ু আমার। আমি হেসে উঠি, ঘাস খাই, তারপর চিবুকের দাড়ি গজায়।"
জীবন থেকে বিদায়ের মুহূর্তে তাঁর মনে জাগে এক প্রশ্ন, "তাহলে আমি কি চললাম?"
শীতের প্রকোপ আর নিউমোনিয়ার যন্ত্রণাকে প্রেমের সাথে তুলনা করে তিনি প্রশ্ন করেন, "বহে মাঘের শীতের বাতাস—হাড়কাঁপানো আর মাংসে কামড় দেওয়া। নিঃশব্দ চাদরে চরাচর জড়িয়ে রাখার কী দরকার ছিল? তুমি আমার হাতের তালুর চেয়ে চেনা। সঘন মর্মর ফুল কই ফিরে এসে জানালে না তো। খোলা জানালা পেয়ে কেন আমার বুকের মর্মরে দিলে তীব্র নিউমোনিয়ার প্রেম। কী দরকার ছিল?"
পাহাড়ের প্রতি আকুলতা আর স্মৃতির ভিড়ে কবি খুঁজে ফেরেন এক অদ্ভুত শান্তি। তিনি লিখেছেন, "আমরা যেতে চাইছিলাম পাহাড়ে। পাহাড়ে গেলে নাকি ঝিঁঝি পোকারা সূর্যাস্ত দেখায়, খাদে খাদে জ্বলে ওঠে তারা। দোহাই তোমাদের এখনই সাঙ্গ কোরো না আড্ডা। দুরন্ত কথা বলা থামাইয়ো না। আমাদের সাথে চলো।"
স্মৃতি আর কল্পনার এক অদ্ভুত মেলবন্ধনে তিনি বলেন, "দুর্দান্ত আমি আর কুজ্ঝটিকা এক বাড়িতে থাকি। সেই বাড়িতে পালন করি একটা একটা মুক্তা আর আশার মৌমাছি। তবু হারায়ে যাওয়া ভেড়া খেলতে যাক প্রজাপতির পায়ের সাথে। স্মৃতিরা আমাদের সাথে চলুক।"
কবিতার শেষাংশে কবি লালন শাহর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও আধ্যাত্মিক আকুলতা প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, "লালন লালন শাহ, লালন সাঁইজি বন্ধু লালন। ক্ষমা করো করো আমাগেরে বুকে তুলে নাও। তোমারে পেয়েছিল কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া। আকাশের নিচে কয়েক ঘর খড়ের দোচালা। কালীগঙ্গা মধুমতী গড়াই পদ্মা। তারার আলোয় নিচে একতারায় টুনটুনানি।"
লালন সংসদের পরিবেশ আর সাধুদের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, "কখন যে হয়ে গেলে লালন ফকির। গড়াইয়ের চরে একদিল শাহর মাজারে। বন্ধুরে নিয়ে গেলে সেখানে দেখি আরেক বন্ধুর ছবি টাঙানো। পাশে করতাল, খঞ্জনি, দোতরা, হারমোনিয়াম সাজানো।"
লালন সংসদের ছাদের কথা মনে করে কবি লিখেছেন, "২৭ নম্বরে লালন সংসদের ছাদে সাধুদের পদধূলি জমায়ে টবে কি সুন্দর বাগান করেছে দেলু ভাই! সেই টানে ফুলে ফুলে এসে বসেন নরসিংদী থেকে হুমায়ুন সাধু। তারপর ৯ মিনিট ধরে কেন পিতলের পাইপ বাজালেন হে সাঁই তোমার স্মরণে!"
সবশেষে লালন সাঁইয়ের প্রতি তাঁর আকুল প্রার্থনা, "তোমারে কখন যে ওরা বানাল লালন ঠাকুর, আমরা লজ্জায় মরি! তুমি সাঁই তুমি ফকির, ফুলে ফুলে ঢুলে ঢুলে আছ আকুল হয়ে দেহতরি শেখাও আমাদের। চাতকের মতো শুধু বাদলপানি খেতে চাই সংসারে জ্যান্ত মরা আমরা। খুঁজি আলেক সাঁই!"