মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের জামিন আবেদনের শুনানি চলাকালীন আদালতের ভেতরে ও বাইরে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক আইনজীবীদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা, হট্টগোল এবং হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। আজ রোববার দুপুরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলমের এজলাসে এই অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। আইনজীবীদের দুই পক্ষের মধ্যে চরম উত্তেজনার কারণে বিচারক একবার এজলাস ছেড়ে খাসকামরায় ফিরে যান। পরবর্তীতে তিনি পুনরায় এজলাসে এসে শুনানি শুরু করেন, তবে তখনও বিএনপি ও জামায়াতপন্থী আইনজীবীদের মধ্যে তর্কাতর্কি এবং পোশাক টানাটানির ঘটনা অব্যাহত ছিল।

এজলাস কক্ষে এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির পর শুনানি শেষ হয়। তবে আখতারুজ্জামানকে আদালত ভবনের নিচতলায় নামানোর সময় বিএনপি ও জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা আবারও হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। এই ঘটনার জন্য একপক্ষ অন্যপক্ষকে দায়ী করেছে।

উল্লেখ্য, ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি সংকট নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, সরকারি কাজে বাধা প্রদান এবং একজন কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলায় গত শুক্রবার পুলিশ মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে। এক দিনের রিমান্ড শেষে আজ দুপুরে তাঁকে আদালতে হাজির করে কারাগারে পাঠানোর আবেদন জানায় পুলিশ। অন্যদিকে, আখতারুজ্জামানের আইনজীবী তাঁর জামিনের জন্য আবেদন করেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত বছর ডিসেম্বরে বিএনপি থেকে দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া আখতারুজ্জামান জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। আজ তাঁর পক্ষে আদালতে হাজির হন জামায়াতপন্থী একদল আইনজীবী। বিচারক এজলাসে আসার আগেই আদালতকক্ষে দাঁড়ানোর জায়গা নিয়ে বিএনপির সমর্থক আইনজীবীদের সঙ্গে তাঁদের বিরোধ শুরু হয়, যা দ্রুতই ধাক্কাধাক্কি ও হট্টগোলে রূপ নেয়।

এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে বেলা ২টা ৪১ মিনিটে বিচারক এজলাসে প্রবেশ করেন। তবে তাঁর উপস্থিতিতেও আইনজীবীদের উত্তেজনা প্রশমিত হয়নি। পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিচারক এজলাস ছেড়ে খাসকামরায় চলে যান। বেলা ২টা ৪৫ মিনিটে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে তিনি পুনরায় এজলাসে ফিরে আসেন।

এ সময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে হাত উঁচু করে বিচারকের অনুমতি নিয়ে আখতারুজ্জামান আদালতকে বলেন, ‘আমার পক্ষে ১০ জন আইনজীবী শুনানি করবেন। ১০ জনকেই হেয়ারিং করার অনুমতি প্রার্থনা করছি।’ তবে শুনানি চলাকালেও বিচারকের উপস্থিতিতে দুই পক্ষের আইনজীবীরা পুনরায় উচ্চবাচ্য ও তর্কে জড়িয়ে পড়েন।

আখতারুজ্জামানকে কারাগারে আটক রাখার আবেদনের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বিমানবন্দর থানার উপপরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মাজেদুল ইসলাম বলেন, জিজ্ঞাসাবাদকালে আসামি মামলার ঘটনার বিষয়ে সত্যতা স্বীকার করেছেন এবং কিছু তথ্য প্রদান করেছেন। আসামির কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদি যাচাই-বাচাই করা হচ্ছে। মামলার জোর তদন্ত অব্যাহত আছে। এমতাবস্থায় মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে তদন্তকার্য সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত ওই আসামিকে জেলহাজতে আটক রাখা একান্ত প্রয়োজন।

শুনানির সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক আদালতকে জানান, তিনি (আখতারুজ্জামান) কয়েকবারের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক মেজর। তাঁর বিরুদ্ধে আনা এই অভিযোগ মিথ্যা। তাঁকে গতকাল জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত অনুমোদন দেয়। আজ রিমান্ড শেষে তাঁকে আদালতে আনা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে বিমানবন্দরের ঘটনায়, সেটি তাঁর কোনো অপরাধ নয়। তিনি একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

বিমানবন্দরে আখতারুজ্জামানের সঙ্গেই অবিচার ও অন্যায় হয়েছে দাবি করে আইনজীবী আরও বলেন, শুধু তিনিই নন, এই ভোগান্তির শিকার হয়েছেন আরও অনেকেই। এগুলোর কয়েকটি ভিডিও ফেসবুকে দেখা গেছে। তাঁর যে আচরণের বিষয়ে মামলা হয়েছে, মূলত সেটি তাঁর প্রতিবাদ। অন্যায়–অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাই কি একজন সচেতন নাগরিক ও মুক্তিযোদ্ধার অপরাধ? একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন সংসদ সদস্য ও সাবেক মেজর হিসেবে যেখানে সবাই তাঁকে সম্মান করেন, শ্রদ্ধা করেন, সেখানে বিমানবন্দরে তাঁর সঙ্গে অন্যায় আচরণ করা হয়েছে।

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে দাবি করে তাঁর আইনজীবী আরও বলেন, ‘তিনি অসুস্থ, নানা রোগে আক্রান্ত। আমরা যেকোনো শর্তে তাঁর জামিন আবেদন জানাচ্ছি। মামলায় দাখিল করা ধারাগুলো জামিনের যোগ্য। আমরা জামিন প্রার্থনা করছি।’ এই সময়ে আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী সাইফুর রহমানও জামিনের আবেদন জানান।

জামিনের তীব্র বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী আদালতকে বলেন, ‘আমরা একটা ভিডিও দেখেছি। তাতে দেখা যাচ্ছে, এই আসামি বিমানবন্দরে খুবই বাজে আচরণ করছেন। তিনি এলোপাতাড়িভাবে মালামাল ছুড়ে মারছেন। প্রতিবাদ কোনো অপরাধ নয়, কিন্তু প্রতিবাদের ভাষাটা হতে হবে প্রতিবাদের মতো। তিনি সেখানে প্রতিবাদ করেননি, তিনি অপরাধ করেছেন। একজনকে গায়ে হাত দিয়ে অ্যাসল্ট করা কখনো প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে না।’

পিপি ওমর ফারুক আরও বলেন, ‘বিএনপি এ দেশে বহু নেতার জন্ম দিয়েছে। তারা সুবিধা নিয়ে ভুলে যায়। এমন বহু হারামখোর আছে। যারা আমাদের মধু খেয়ে বেঁচে ছিল।’

এই মন্তব্যের পর জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা উত্তেজিত হয়ে প্রতিবাদ জানান। অন্যদিকে, কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আখতারুজ্জামানকে পিপির দিকে তাকিয়ে হাসতে এবং ‘না’ সূচকভাবে মাথা নাড়াতে দেখা যায়।

পিপি আদালতে দাবি করেন, এ মামলায় কখনোই জামিন হতে পারে না। এ ধরনের আচার-আচরণের পেছনে কোন শক্তি বা মদদ আছে, তা তদন্তের স্বার্থে জানা প্রয়োজন। আসামি জামিন পেলে তদন্ত বিঘ্নিত হবে।

পিপি ওমর ফারুকের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে আসামিপক্ষের আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘পিপি সাহেব গতকাল আসামিকে বলেছেন “বাতিল মাল”। আজ বললেন “মধু খাওয়ার” কথা। এটা কোনো শুনানি হতে পারে না। আমরা প্রতিবাদ জানাই।’

শুনানির এই পর্যায়ে বেলা ৩টা ৮ মিনিটে পুনরায় বিএনপি ও জামায়াতপন্থী আইনজীবীদের মধ্যে হইচই শুরু হলে বিচারক তাঁদের থামতে বলেন।

এরপর আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেন, ‘বয়স, শারীরিক কন্ডিশন (পরিস্থিতি) ও অসুস্থতা বিবেচনায় আমরা আসামির জামিন চাচ্ছি। এটা জামিনযোগ্য মামলা। তিনি জামিনের হকদার।’ এই বক্তব্যে আপত্তি জানিয়ে পিপি বলেন, ‘আখতারুজ্জামান ফ্যাসিস্টের পক্ষে গিয়ে অবৈধ নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। জুলাই আন্দোলনের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। এরপর নিজেকে বাঁচাতে জামায়াতে যোগ দিয়েছেন এবং ওনারাও (জামায়াত) আমাদের গালি দেওয়াতে আশ্রয় দিয়েছেন। জামায়াত কিছু লোককে পালে শুধু সরকারকে গালিগালাজ করার জন্য, সরকারের উন্নয়নকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য।’

উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত জামিন নামঞ্জুর করে আখতারুজ্জামানকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ প্রদান করেন।

আদালতের আদেশের পর পুলিশ কঠোর নিরাপত্তায় আখতারুজ্জামানকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামাতে শুরু করে। তবে একতলায় নামতেই আদালত ভবনের নিচে বিএনপি ও জামায়াতপন্থী আইনজীবীদের হাতাহাতি ও হট্টগোলের খবর পেয়ে পুলিশ তাঁকে সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখে।

সেই সময় আদালত ভবনের নিচে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করা জামায়াতপন্থী আইনজীবী ও তাঁদের সমর্থকদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা। এর ফলে উভয় পক্ষ পুনরায় ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তীতে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলে আখতারুজ্জামানকে নিচে নামানো হয়।

পরবর্তীতে এক ব্রিফিংয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ‘জামায়াত সব জায়গায় মব সৃষ্টি করতে চায়। সেদিন বিমানবন্দরে আখতারুজ্জামান মব সৃষ্টি করেছে। আজ জামায়াতের আইনজীবী ও বাইরে থেকে আসা তাদের সমর্থকেরা মব সৃষ্টি করেছে। তাদের উদ্দেশ্য হলো, মব সৃষ্টি করে পরিস্থিতি খারাপ করা। সকাল থেকেই দেখছি, তারা জড়ো হয়েছে। আগে থেকেই এজলাস কক্ষ ভরে রেখেছে তারা।’

অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘ওনারা বাইরের লোক বলতে কী বোঝাইতে চাইছে? আমরা কোনো বাইরের লোক আনি নাই। ৩৫ হাজার আইনজীবীর একজন করে মক্কেল থাকলেই ৩৫ হাজার মক্কেল হয়। ওনারা যে কথা বলছেন, এটা মোটেই সঠিক না।’