সবুজে ঘেরা এক গ্রাম, আর সেখানে বিশাল এক খেলার মাঠ। সেই মাঠেই আজ কিশোরী থেকে শুরু করে মধ্যবয়সী নারীদের ভিড়। এক হাতে বাঁকানো ধনুক আর অন্য হাতে সুচালো তির। দৃষ্টিসীমার প্রায় ৫০ ফুট দূরে পুঁতে রাখা কলাগাছ। ধনুক থেকে তির ছুড়তেই তা বিদ্যুৎগতিতে গিয়ে বিঁধছে লক্ষ্যবস্তুতে। আর এই দৃশ্য দেখে শত শত নারী, পুরুষ ও শিশু-কিশোরের করতালি ও হর্ষধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো মাঠ।
ব্রিটিশবিরোধী সাঁওতাল বিদ্রোহের স্মৃতি, আত্মরক্ষার সামাজিক কৌশল এবং বন্যপ্রাণী শিকারে ব্যবহৃত দেশীয় অস্ত্রের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার ধানজুড়ি কবরস্থান মাঠে আজ রোববার দিনব্যাপী তির-ধনুক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। ধানজুড়ি আদিবাসী স্পোর্টিং ক্লাব এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে।
সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলা এই প্রতিযোগিতায় ধানজুড়ি মিশন এলাকার মানজি পরিষদের অধীনে মোট ১২টি দল অংশগ্রহণ করে। প্রতিটি দলে ৫ জন করে মোট ৬০ জন তিরন্দাজ অংশ নেন। তবে পুরো প্রতিযোগিতার বিশেষ আকর্ষণ ছিল ১৫ জন নারী তিরন্দাজের তির নিক্ষেপের দক্ষতা।
প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া নারী তিরন্দাজদের অধিকাংশ ছিলেন গৃহিণী অথবা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। কেউ কেউ রঙিন শাড়িতে সেজেছিলেন, আবার কেউ কেউ খোঁপায় গুঁজেছিলেন রঙিন ফুল। মঞ্চের মাইকের ঘোষণায় মাঠের মাঝখানে প্রদর্শিত হচ্ছিল তির-ধনুকের অসাধারণ কারিশমা। নারী তিরন্দাজদের ধনুক থেকে লক্ষ্যভেদ করার সাথে সাথেই দর্শকদের করতালিতে মুখর হয়ে উঠছিল চারপাশ। অন্যদিকে, নির্দিষ্ট সীমানার বাইরে তির-ধনুক হাতে অপেক্ষমাণ প্রতিযোগী তিরন্দাজদের চোখেমুখে ছিল প্রতিপক্ষ দলকে পরাজিত করার দৃঢ় সংকল্প।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পল্লির ওই মাঠে তির-ধনুকের এই খেলা দেখতে আসা দর্শকের সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো। পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলে প্রতিযোগী এবং দর্শক—উভয় পক্ষের মধ্যেই ছিল বাড়তি কৌতূহল।
প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া তিরন্দাজ শান্তনি মুরমু মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমি একজন মা হিসেবে তির-ধনুক খেলতে এসেছি। এটি আমাদের সামাজিক ঐতিহ্য। আমাদের এ খেলা দেখে যাতে আমাদের মেয়েরা, বাবুরা (ছেলে) খেলা শিখতে পারে, সে জন্য আমরা খেলছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পাওয়াটা বড় বিষয় নয়, বরং এ খেলা দেখে আমাদের সন্তানেরা নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য তির-ধনুকের ব্যবহার শিখতে অনুপ্রাণিত হবে।’
আয়োজক কমিটির সমন্বয়ক রঞ্জিত হেম্ব্রম মুক্তকণ্ঠকে জানান, তির-ধনুক হলো সাঁওতাল সম্প্রদায়ের একটি প্রাচীন ঐতিহ্য। সাঁওতাল পরিবারের যুবকেরা প্রতিবছর অন্তত একবার তির-ধনুক নিয়ে শিকারে বের হন। এই অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য হলো এই ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে সব সময় সামনে ধরে রাখা এবং তুলে ধরা।
প্রতিযোগিতার শেষে জবই দল চ্যাম্পিয়ন এবং ডিএলসি দল রানারআপের মর্যাদা লাভ করে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ধানজুড়ি মিশনের পালপুরোহিত ফাদার মানুয়েল হেম্ব্রম।