২০৩৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের জন্য সৌদি আরব যে সব স্টেডিয়ামের পরিকল্পনা করে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল, তার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল নিওম স্টেডিয়াম। মাটি থেকে অনেক উচ্চতায় ‘দ্য লাইন’-এর ভেতরে নির্মাণের কথা ছিল ৪৬ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার এই অনন্য মাঠটির। তবে এখন জানা যাচ্ছে, সেই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পটিই অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হওয়ার পথে।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এমন দুই গোপন সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, নিওম স্টেডিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনাটি নীরবে সরিয়ে রাখছে সৌদি আরব। মূলত যে বিশাল নগর প্রকল্পের অংশ হিসেবে এই স্টেডিয়ামটি গড়ে ওঠার কথা ছিল, সেই নিওম এবং বিশেষ করে ‘দ্য লাইন’-এর কাজ পিছিয়ে যাওয়া এবং প্রকল্পের পরিসর কমিয়ে আনার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তথ্য অনুযায়ী, নিওম স্টেডিয়াম নির্মাণের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২৫০ কোটি মার্কিন ডলার।

তবে সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে এই স্টেডিয়ামটি বাতিল করার কোনো ঘোষণা দেয়নি। রয়টার্সের পাঠানো প্রশ্নের কোনো জবাব দেয়নি নিওম কর্তৃপক্ষ এবং সৌদি সরকারের গণমাধ্যম দপ্তর। অন্যদিকে, সৌদি ক্রীড়া মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে ২০৩৪ বিশ্বকাপ আয়োজক কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন পাঠিয়েছে।

আয়োজক কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে, বিশ্বকাপের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হচ্ছে। তারা অন্য কয়েকটি নির্মাণাধীন স্টেডিয়ামের ছবিও প্রকাশ করেছে। তবে নিওম স্টেডিয়ামটি আদৌ নির্মিত হবে কি না এবং এর নির্মাণ ব্যয় সংক্রান্ত নির্দিষ্ট প্রশ্নের কোনো উত্তর তারা দেয়নি।

২০৩৪ বিশ্বকাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সৌদি আরব পাঁচটি শহরে মোট ১৫টি স্টেডিয়াম নির্মাণ অথবা সংস্কারের পরিকল্পনা করেছে। এর পাশাপাশি রয়েছে কয়েক ডজন অনুশীলন কেন্দ্র। এমইইডির হিসাব অনুযায়ী, এই সব প্রকল্পের মোট মূল্য প্রায় ২ হাজার ২৭০ কোটি ডলার।

এই সব প্রকল্পের মধ্যে নিওম স্টেডিয়াম শুরু থেকেই সবার নজর কেড়েছিল। সৌদি আরবের বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তাবে এটিকে ‘দ্য লাইন’-এর ভেতরে উঁচুতে নির্মিত একটি অত্যাধুনিক স্টেডিয়াম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।

উল্লেখ্য, ১৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ কাচ ও ইস্পাতের এক নগরী হিসেবে ‘দ্য লাইন’-এর পরিকল্পনা করেছিল সৌদি আরব। পুরো নিওম প্রকল্পই যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’-এর অন্যতম প্রধান প্রতীক। তেলের ওপর অর্থনীতির নির্ভরতা কমিয়ে নতুন নতুন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোই ছিল এই মহাপরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য।

কিন্তু গত কয়েক বছরে ‘দ্য লাইন’-এর পরিকল্পনা সংকুচিত হয়েছে এবং কাজের সময়সূচিও পিছিয়ে গেছে। চলতি বছরের এপ্রিলে নিওমের মালিক পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের গভর্নর ইয়াসির আল রুমাইয়ান জানিয়েছিলেন, “দ্য লাইন এখন আর তাদের অগ্রাধিকারের প্রকল্প নয় এবং ২০৩০ সালের আগেই সেটি প্রস্তুত হওয়া অপরিহার্যও নয়।” তবে সে সময় তিনি কোনো প্রকল্প বাতিল করার কথা অস্বীকার করেছিলেন।

সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব অত্যন্ত ব্যয়বহুল বিশাল প্রকল্পগুলোর পরিবর্তে তুলনামূলক দ্রুত আর্থিক মুনাফা পাওয়া যায় এমন বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছে। এরই মধ্যে রিয়াদের নিউ মুরাব্বা প্রকল্পের কেন্দ্রীয় অংশ হিসেবে বিশাল ঘনকাকৃতির ‘দ্য মুকাব’-এর নির্মাণকাজও স্থগিত হওয়ার খবর দিয়েছে রয়টার্স।

এর পাশাপাশি আঞ্চলিক সংঘাতের অর্থনৈতিক চাপও প্রভাব ফেলছে। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষতির প্রভাব পড়েছে সৌদি অর্থনীতিতে। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় গত সপ্তাহে আগের পূর্বাভাসের চেয়ে বড় বাজেট ঘাটতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।

তবে ২০৩৪ বিশ্বকাপের সব প্রকল্প থেমে নেই। পূর্বাঞ্চলীয় শহর আল খোবারের আরামকো স্টেডিয়ামের নির্মাণ কাজ এই বছরের শেষ নাগাদ শেষ হওয়ার কথা। আগামী জানুয়ারিতে সেখানে প্রথম ম্যাচ আয়োজনের প্রস্তুতিও চলছে। এছাড়া অন্য কয়েকটি বিশ্বকাপ স্টেডিয়ামের কাজও দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।