সৌদি আরবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের পাশাপাশি এবার ভিন্ন এক কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। তারা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ঢাল বানিয়ে সৌদি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে জোরালো প্রচারযুদ্ধ শুরু করেছে। আর এই অপপ্রচারে সৌদি রাজপরিবারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে হুতিদের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছেন কুখ্যাত মার্কিন যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিন। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ সম্প্রতি তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু গোপন ফাইল প্রকাশ করেছে, যা এখন হুতিদের প্রচারণার মূল ভিত্তি।

প্রকাশিত ওই নথির বরাত দিয়ে হুতিরা দাবি করছে, সৌদি রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা পবিত্র কাবার গিলাফ কুখ্যাত অপরাধী এপস্টিনের ব্যক্তিগত দ্বীপে পাঠিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন পাচারের মামলায় কারাবন্দী থাকা অবস্থায় ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের কারাগারে মারা যান এপস্টিন। সে সময় কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন।

সৌদি আরবের বিরুদ্ধে এই গুরুতর অভিযোগ তুলে হুতি প্রেসিডেন্ট মাহদি আল-মাশাত বলেন, “যাঁরা এপস্টিনকে পবিত্র কাবার গিলাফ দিয়েছিলেন, তাঁরাই মূলত মক্কাকে নিশানা করছেন।” তবে এই স্পর্শকাতর অভিযোগের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেনি।

এর আগে গত মাসে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল যে, হুতিরা পবিত্র মক্কা নগরীকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, মুসলমানদের উসকে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই লজ্জাজনক হামলা চালানো হয়েছে। যদিও হুতিরা এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে। পাল্টা আক্রমণ করে হুতি প্রেসিডেন্ট মাহদি আল-মাশাত পুনরায় বলেন, “যাঁরা এপস্টিনকে পবিত্র কাবার গিলাফ দিয়েছিলেন, তাঁরাই মূলত মক্কাকে নিশানা করছেন।” সৌদি আরব এই বক্তব্যের কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

হুতিদের প্রচার নেটওয়ার্কের বিভিন্ন মাধ্যমে মাহদি আল-মাশাতের এই বক্তব্য ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এক্সে ২ লাখ ৭০ হাজারের বেশি অনুসারী থাকা একজন ইয়েমেনি কৌতুক অভিনেতা এই বিষয় নিয়ে ভিডিও প্রকাশ করেছেন। এমনকি ইয়েমেনের একজন ঐতিহ্যবাহী সংগীতশিল্পীও এই ঘটনা নিয়ে গান তৈরি করেছেন।

হুতিদের রাজনৈতিক ভাষণেও এখন নিয়মিতভাবে এপস্টিনের প্রসঙ্গ উঠে আসছে। চলতি মাসে এক ভাষণে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের নেতৃত্বে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে চালানো হামলার প্রশংসা করার পাশাপাশি এপস্টিনের কথা উল্লেখ করেন হুতি নেতা আবদুল-মালিক আল-হুতি। এর আগে ২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখলের পর সেপ্টেম্বরের ভাষণেও তিনি এপস্টিনের প্রসঙ্গ টেনেছিলেন। গত ফেব্রুয়ারির এক বক্তব্যে আল-হুতি স্পষ্টভাবে বলেন, “এপস্টিনের ফাইলগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। এগুলো এমন এক জায়নবাদী আঁতুড়ঘর উন্মোচন করে, যা নেতা ও অভিজাতদের গড়ে তোলে।”

ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল-বাশা মনে করেন, হুতিদের প্রচারব্যবস্থা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়, বরং টেলিভিশন, রেডিও, ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে একটি সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। এর পেছনে একটি শক্তিশালী মতাদর্শিক প্রচারক দল কাজ করছে। আল-বাশার মতে, সবাই অর্থের বিনিময়ে কাজ করছেন না, তবে প্রচারসামগ্রী ছড়িয়ে দিতে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তিনি আরও জানান, এপস্টিনকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দুর্নীতির প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ইহুদি ও জায়নবাদীরা বিশ্ব পরিচালনা করে—এমন এক ইহুদিবিদ্বেষী ‘ষড়যন্ত্রতত্ত্ব’ ছড়াতেও তাঁর নাম কাজে লাগানো হচ্ছে।

লন্ডনভিত্তিক গবেষক মোস্তফা আয়াদ বলেন, হুতিরা সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের সংঘাতকে কেবল রাজনৈতিক লড়াই নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও এপস্টিন শ্রেণির বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করছে। ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও, তারা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ‘একই শিবিরে’ রয়েছে—এই ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত করতে চায় হুতিরা।

হুতিদের এই পরিকল্পিত প্রচারণার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ভাবমূর্তি নষ্ট করা। চলমান এই সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইয়েমেনি কৌতুক অভিনেতা মোস্তফা আল-মুমর সৌদি আরবের বর্তমান কর্মকাণ্ড এবং যুবরাজের সমালোচনায় বিভিন্ন গান, মন্তব্যধর্মী ভিডিও ও ছোট নাটক তৈরি করছেন।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা শুরু করে। এই বিদেশি হস্তক্ষেপ এবং দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের ফলে ইয়েমেনে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। সৌদি সামরিক অভিযানের ফলে সহিংসতা, ক্ষুধা ও রোগের কারণে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা যায়।

এদিকে গত আগস্টে ইয়েমেনে সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার পর প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার চলতি সপ্তাহের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিকতম এই সংঘাতে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সৌদি আরবের বিমান চলাচল ও জ্বালানি অবকাঠামোতে ধারাবাহিক হামলা চালাচ্ছে হুতিরা, যাতে অন্তত ২২ জন বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।