রাজধানীর বারিধারায় একটি প্রাইভেট কারের ধাক্কায় নির্মাণশ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় অভিযুক্ত কিশোরের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন আদালত। আজ রোববার ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮-এর বিচারক মো. আব্দুল মোক্তাদির শুনানি শেষে এই আদেশ প্রদান করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শরীফ উদ্দীন মামুন মুক্তকণ্ঠকে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আজ ওই কিশোরের আইনজীবীরা জামিনের আবেদন জানান। তবে রাষ্ট্রপক্ষ এই আবেদনের তীব্র বিরোধিতা করে। উভয় পক্ষের বিস্তারিত শুনানি পর্যালোচনার পর আদালত জামিন নামঞ্জুর করার সিদ্ধান্ত নেন।
আদালতে অভিযুক্ত কিশোরের পক্ষে জামিন শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী গোলাম মোস্তফা খান। তিনি আদালতকে জানান, ঘটনার দিন চালক কৌশলে বাঁ দিক দিয়ে গাড়িটি বের করেছিলেন এবং ওই শিশু নির্দোষ। বিচারকের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘এই মামলায় আপনার জাজমেন্ট হচ্ছে ৩ লাখ বা ৫ লাখ টাকা জরিমানা। কিন্তু আমরা এটা আগেই দিয়ে এসেছি ভুক্তভোগী পরিবারকে। বাদীপক্ষ আদালতে এসেছে। তাদের আপত্তি নেই।’ এই বক্তব্যের সময় নিহত নির্মাণশ্রমিকের বাবা ও ভাই আদালতের বেঞ্চের সামনে গিয়ে দাঁড়ান।
আসামিপক্ষের আইনজীবী আরও যুক্তি দেন যে, ‘সে (অভিযুক্ত) একজন শিশু। সে জামিনের হকদার।’ এই পর্যায়ে বিচারক জানতে চান, অভিযুক্ত কিশোর কতদিন ধরে হাজতে আছেন। জবাবে আইনজীবী জানান, ‘আজ ১২ দিন হাজত খাটছে।’
অন্যদিকে, পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) বিষয়টিকে একটি চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ওই কিশোরের কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না এবং গাড়ি চালানোর কোনো বৈধ অনুমতিও তার ছিল না, তাই জামিনের বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তি রয়েছে। এর প্রেক্ষিতে বিচারক প্রশ্ন করেন, শিশুর কি আর লাইসেন্স থাকে? তখন আসামিপক্ষের আইনজীবী দাবি করেন, ড্রাইভিং সিটে ওই শিশু ছিল না।
আদালত পর্যবেক্ষণ করে বলেন, ‘সিসিটিভি ফুটেজে এটা দেখা গেছে যে সে (ওই কিশোর) ওই দিক থেকে বের হচ্ছে। এখন জামিন পেলে এই মেসেজটা যাবে যে এমন অপরাধ করে, এমন বেপরোয়া গাড়ি চালিয়েও বের হওয়া যাবে। সমাজের কাছে একটা খারাপ মেসেজ যাবে। এই ঘটনাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়ে যাবে। আইন-বিচারকে বিত্তবানেরা ও শিশুরা সহজ ভাববে।’
উভয় পক্ষের যুক্তি ও প্রমাণাদি পর্যালোচনার পর আদালত শেষ পর্যন্ত জামিন নামঞ্জুর করেন। উল্লেখ্য, গত ২৪ সেপ্টেম্বর একই আদালত ওই কিশোরকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে (সংশোধনাগার) পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেদিন জামিনের আবেদন দাখিল হলে আদালত ২৫ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেন এবং আংশিক শুনানির পর আজকের দিনটি উচ্চতর শুনানির জন্য নির্ধারিত করা হয়।
ঘটনাটি ঘটে গত ২৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে বারিধারা ডিপ্লোমেটিক জোনের ১ নম্বর সড়কে। সেখানে দ্রুতগতির একটি প্রাইভেট কারের ধাক্কায় মেহেদী হাসান (২৪) নামের এক নির্মাণশ্রমিক নিহত হন। নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সোনারায় গ্রামের বাসিন্দা মেহেদী ঘটনার সময় ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। হঠাৎ দ্রুতগতির গাড়িটি ফুটপাতে উঠে তাকে পিষ্ট করে, যার ফলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
এই মর্মে গুলশান থানায় মামলা দায়ের করেন নিহত মেহেদীর ভাই মোক্তাদির ইসলাম। প্রাথমিক মামলায় কোনো কিশোরের নাম উল্লেখ করা হয়নি; বরং আকাশ মারক (৪৪) নামের এক ব্যক্তিকে চালক হিসেবে আসামি করা হয়, যাকে পুলিশ এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি। তবে দুর্ঘটনার পরপরই উপস্থিত লোকজন চালকের আসনে থাকা কিশোরকে আটক করে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেন। পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে প্রথমে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেয়। এই বিষয়ে ‘চালকের আসনে ছিল কিশোর, মামলায় আসামি আরেকজন’—শিরোনামে মুক্তকণ্ঠ অনলাইনে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলে পুলিশ ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে কিশোরের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পায় এবং তাকে আইনের আওতায় এনে পুলিশি হেফাজতে নেয়। এরপর আদালত তাকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর আদেশ দেন।