রাজধানীর বারিধারায় ফুটপাতে বিশ্রামরত এক নির্মাণশ্রমিক গাড়িচাপায় নিহত হওয়ার ঘটনায় আইনের সংস্পর্শে আসা এক কিশোরকে জামিন দিয়েছেন আদালত। ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮-এর বিচারক আজ বৃহস্পতিবার উভয় পক্ষের শুনানি শেষে দুই হাজার টাকার মুচলেকায় ওই কিশোরের জামিন মঞ্জুর করেন।
আদালতের জামিন আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, “আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত শিশু বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে মেহেদী হাসান মিমকে চাপা দিয়ে প্রাণহানির অভিযোগে তাকে আটক করা হয়। শিশু আইন, ২০১৩-এর ৩৪ ধারার বিধান অনুসারে বর্ণিত অভিযোগে দোষী প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ তিন বছর মেয়াদে আটকাদেশের বিধান আছে।” আদেশে আরও জানানো হয়, ওই কিশোর গত ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ১ মাস ৫ দিন যাবৎ আটক রয়েছেন। টঙ্গীর গাজীপুরস্থ শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের (বালক) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই কিশোরের বর্তমান শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত জটিল। তার বিশেষায়িত চিকিৎসা, নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও সার্বক্ষণিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের অনুমোদিত ধারণক্ষমতা ৩০০ জনের বিপরীতে বর্তমানে ১ হাজার ১৯ জন শিশু নিবাসী থাকায় বিদ্যমান জনবল, অবকাঠামো ও পরিচর্যাসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কারণে তার প্রয়োজনীয় নিবিড় পরিচর্যা নিশ্চিত করা অত্যন্ত দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শিশুটির চিকিৎসার ধারাবাহিকতা, নিরাপত্তা ও সুস্থতা নিশ্চিত করতে তার সর্বোত্তম স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি বলে মনে করেছে আদালত।
আদালত তার আদেশে আরও উল্লেখ করেন, “ওই কেন্দ্রে অবস্থানকালে শিশুটির শৃঙ্খলাবোধ ও আচার-ব্যবহার সন্তোষজনক মর্মে উল্লেখ করা হয়েছে।” এছাড়া ওই কিশোরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রত্যয়নপত্রের কথা উল্লেখ করে আদালত জানান, তার শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে তাকে জামিনে মুক্তি দেওয়া প্রয়োজন। মানবিক কারণে এবং গুরুতর স্বাস্থ্যগত অবস্থার কথা বিবেচনা করে আদালত বলেন, “এমতাবস্থায়, আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত শিশুর গুরুতর স্বাস্থ্যগত অবস্থা বিবেচনায় যথোপযুক্ত এবং সুচিকিৎসার প্রয়োজনে এবং তার শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে সম্পূর্ণ মানবিক কারণে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায় আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত শিশুকে দুই হাজার টাকা মুচলেকায় তার পিতা এবং একজন বিজ্ঞ কৌঁসুলির জিম্মায় জামিন মঞ্জুর করা হলো।”
আদালতে জমা দেওয়া শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের প্রতিবেদনে বিস্তারিত জানানো হয়েছে যে, গত ১৮ অক্টোবর ওই কিশোরের তীব্র জ্বর ও অতিরিক্ত বমি শুরু হয়। প্রথমে তাকে টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে পরীক্ষায় তার ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রতিবেদনে তার অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ (ইন্টারনাল হেমোরেজ), আঘাতজনিত মাথার ক্ষত (ট্রমাটিক হেড ইনজুরি) ও মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত জটিলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি তার শ্রবণশক্তি হারানোর বিষয়টিও প্রতিবেদনে এসেছে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, তার রক্তে সিরাম ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা ৪ দশমিক ৩ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার এবং সিরাম বিলিরুবিনের মাত্রা ৫ দশমিক ৪ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার। আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, এসব ফলাফল কিডনি ও যকৃতের কার্যকারিতাসংক্রান্ত গুরুতর জটিলতার আশঙ্কা নির্দেশ করে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শিশুটির চিকিৎসার ধারাবাহিকতা, নিরাপত্তা ও সুস্থতা নিশ্চিত করতে তার সর্বোত্তম স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কেন্দ্রে থাকাকালীন তার আচরণ ও শৃঙ্খলাবোধ সন্তোষজনক ছিল।
উল্লেখ্য, গত ২৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে বারিধারা ডিপ্লোমেটিক জোনের ১ নম্বর সড়কে দ্রুতগতির প্রাইভেট কারের চাকায় পিষ্ট হয়ে মেহেদী হাসান (২৪) নামের এক নির্মাণশ্রমিক ঘটনাস্থলেই মারা যান। নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সোনারায় গ্রামের বাসিন্দা মেহেদী ঘটনার সময় ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, তখনই গাড়িটি ফুটপাতে উঠে যায়। এই ঘটনায় নিহত মেহেদীর ভাই মোক্তাদীর ইসলাম গুলশান থানায় মামলা দায়ের করেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত কিশোরটি ঢাকার গুলশান এলাকার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী এবং তার বয়স ১৭ বছর। তার বাবা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একজন ক্যাপ্টেন। দুর্ঘটনার পর উপস্থিত লোকজন চালকের আসনে থাকা কিশোরকে আটক করে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেন। পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে প্রথমে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দিলেও পরবর্তীতে ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তার সম্পৃক্ততা পাওয়া যায় এবং তাকে আইনের সংস্পর্শে আনা হয়।
এই মামলায় গত ২৪ সেপ্টেম্বর একই আদালত কিশোরটিকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে (সংশোধনাগার) পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেদিনই তার পক্ষে জামিনের আবেদন করা হলেও আদালত তা নামঞ্জুর করেন।
আজকের শুনানিতে কিশোরের আইনজীবী দাবি করেন, দুর্ঘটনার পরপরই ৬০ থেকে ৭০ জন উত্তেজিত মানুষ ওই কিশোরের ওপর সংঘবদ্ধভাবে হামলা চালিয়ে তাকে বেধড়ক মারধর করে। এমনকি আটক হওয়ার পরও তার যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি। এছাড়া জামিন আবেদনে শিক্ষার্থীর স্কুল থেকে দেওয়া প্রত্যয়নপত্রের কথা উল্লেখ করে তার আসন্ন পরীক্ষা ও শিক্ষাগত পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করার অনুরোধ জানানো হয়। আদালত আদেশে জানান, শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থেও তাকে জামিনে মুক্তি দেওয়া প্রয়োজন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শরীফ উদ্দীন মামুন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “রাষ্ট্রপক্ষ থেকে ওই কিশোরের জামিনের বিরোধিতা করেছেন। তবে উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালতে দাখিল করা নথিপত্র যাচাই করে দুই হাজার টাকা মুচলেকায় তার জামিন মঞ্জুর করেন বিচারক।”