‘বয়স কত হলো জাহিদ ভাই?’ ‘৬০।’
কথোপকথনটি যতটা সহজ মনে হয়, সংখ্যাটি জাহিদ হাসানের কাছে ঠিক ততটাই অবিশ্বাস্য। আজ ৪ অক্টোবর ২০২৬, জীবনের ষষ্টদশ বর্ষে পদার্পণ করছেন মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের অত্যন্ত জনপ্রিয় এই অভিনয়শিল্পী। নব্বইয়ের দশকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়া জাহিদ হাসান আজও তাঁর অভিনয় দক্ষতার মাধ্যমে দর্শককে হাসান এবং কাঁদিয়ে থাকেন। তবে ৬০ বছর বয়সে এসে যখন তিনি জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোর হিসাব মেলাতে চেষ্টা করেন, তখন তাঁর উপলব্ধিতে ভেসে ওঠে কিছু ভুল, অনুতাপ এবং মানুষের জন্য কিছু করার তীব্র তাগিদ।
পরিবারের সকল ভাইবোনের মধ্যে জাহিদ সবচেয়ে ছোট। ফলে বয়স বাড়লেও পরিবারের সদস্যদের কাছে তিনি এখনো সেই ছোটটিই রয়ে গেছেন। এই বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অনেকের কাছে আমি বড় হলেও পরিবারের সবার ছোট, তাই আজীবনই সবার কাছে ছোটই থেকে গেলাম। বয়স যে এতটা বেড়েছে, তা ভাবনার মধ্যে আসে না।’
জীবনের এই পর্যায়ে এসে নিজের ভুলগুলো অকপটে স্বীকার করছেন জাহিদ। তাঁর মতে, ‘জীবনে অনেক ভুল করেছি। মানুষ ভুল করবে, সেটাই স্বাভাবিক। আমিও মানুষ। বিগত দিনের ভুলের জন্য কিংবা কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে দুঃখিত। আগামী জীবনটা যেন মানুষের জন্য কিছু করতে পারি। জীবনটা যেন মানুষের কাজে আসে।’
শুধুমাত্র নিজের সুখ বা ভালো থাকার চিন্তা তাঁর কখনোই ছিল না বলে জানান জাহিদ। তিনি বলেন, ‘আমি সব সময় চেয়েছি, সবাইকে নিয়ে ভালো থাকতে। সেই চেষ্টা এখন আরও বেশি। আমার কাছে মনে হয়, সবাইকে নিয়ে এগোনোর চিন্তা করলে দেশেরও উন্নতি হবে।’
দুই সন্তানের জনক জাহিদ হাসান। তাঁর বড় মেয়ে বর্তমানে লন্ডনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজনেস ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। অন্যদিকে তাঁর ছেলে এ লেভেল শেষ করেছেন। জাহিদের ভাষ্যমতে, খুব শীঘ্রই ছেলেটিও উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে যাবেন।
বিদেশে অবস্থানরত মেয়ের কথা প্রায়ই খুব মনে পড়ে জাহিদ হাসানের। ফোনে কথা বলার সময় মেয়ে যখন বলে, ‘বাবা, এই খাবারটা মিস করছি, তোমাকে মিস করছি, বাসার সবাইকে মিস করছি’—তখন জাহিদের মন খারাপ হয়ে যায়। মেয়ের কথা মনে করে মাঝেমধ্যে তাঁর কান্নাও পায়। স্বভাবগতভাবেই তিনি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ। ভালো কোনো কথা শুনলে যেমন তাঁর চোখে পানি আসে, তেমনি অন্যের কষ্ট দেখলে তিনি আরও বেশি আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন।
জন্মদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জাহিদ হাসান পুরনো দিনগুলোতে ফিরে যান। পরিবারের ছোট ছেলে হওয়ায় তাঁর জন্মদিনে বিশেষ আয়োজন থাকত। মা পায়েসসহ নানা রকম খাবার রান্না করতেন, কেক আসত, সাথে থাকত চানাচুর, কলা এবং আরও অনেক কিছু। তবে আশির দশকের শেষ দিকে ঢাকায় আসার পর সেই চিত্র বদলে যায়। তখন ছিল মেসজীবন। ১৯৮৯ সালের এক জন্মদিনে ধানমন্ডি ১৫ নম্বরের একটি মেসের ঘর ঝাড়ু দিচ্ছিলেন জাহিদ। চার-পাঁচজন মিলে একটি ঘরে থাকতেন তারা। রান্নার জন্য বুয়া থাকলেও সব সময় খাবার মুখে তোলার মতো মানসম্মত হতো না। ফলে তখন তারা নিজেরাই ভাজি-তরকারি রান্না করে খেয়ে জীবন কাটাতেন।
সেই জন্মদিনে মেসের এক রুমমেটের বাবা, যিনি পেশায় একজন আইনজীবী ছিলেন, জাহিদের জন্মদিনের কথা শুনে বলেছিলেন, ‘মন খারাপ কোরো না পুলক (জাহিদ হাসানের ডাক নাম), এমন একটা দিন আসবে, যেদিন সারা দেশের মানুষ তোমার জন্মদিন পালন করবে।’ পরবর্তীতে অভিনয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর রেডিও, টেলিভিশন ও পত্রিকায় তাঁকে নিয়ে আলোচনা শুরু হলে সেই মানুষটির কথা খুব মনে পড়ে জাহিদের।
অভিনয়ের স্বপ্ন বুকে নিয়ে সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসেছিলেন জাহিদ হাসান। থিয়েটারে কাজ শুরু করে শুরুর দিকে দলের ঘর মোছা থেকে শুরু করে নানা ছোটখাটো কাজ করতে হয়েছে তাঁকে। পরবর্তীতে গড়ে ওঠে নাট্যকেন্দ্র। মেসজীবনের সেই কঠিন সময়গুলো তাঁকে অনেক কিছু শিখিয়েছে বলে মনে করেন জাহিদ। তিনি বলেন, ‘কষ্টের মধ্যেও একধরনের শান্তি আছে, আবার কষ্টের মধ্যে অশান্তিও আছে। জীবনে কোনো কিছুই সহজে পাওয়া যায় না। তাই কষ্টের পরের সুখটা আসলে অন্য রকম।’
সেই সময় থেকেই তিনি শিখেছেন ছাড় দেওয়া এবং ভাগাভাগি করে নেওয়া। মেসজীবনের একটি মজার স্মৃতি মনে করে জাহিদ বলেন, বাথরুমে সাবান-শ্যাম্পু রেখে এলে অন্যরা তা ব্যবহার করত। এতে তাঁর কোনো আপত্তি ছিল না। তাঁর কাছে সেটিও ছিল একসঙ্গে থাকার জীবনের এক স্বাভাবিক অংশ।