প্রতিযোগিতার ময়দানে দ্রুত গতিতে ছুটে চলছে একটি ছোট গাড়ি। এতে কোনো চালক নেই, নেই কোনো রিমোট কন্ট্রোলার। তা সত্ত্বেও গাড়িটিকে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে এবং পথে আসা বাধাগুলো ডিঙিয়ে এগোতে হয়েছে।
গত ২৫ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর ভারতের হায়দরাবাদে অনুষ্ঠিত হয়েছে ওয়ার্ল্ড রোবট অলিম্পিয়াডের এশিয়া-প্যাসিফিক ওপেন চ্যাম্পিয়নশিপ। এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় একটি স্বয়ংক্রিয় গাড়ি নিয়ে অংশ নিয়েছিল বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত ‘টিম ব্লুপ্রিন্ট’। তারা ফিউচার ইঞ্জিনিয়ার্স বিভাগে তৃতীয় স্থান অধিকার করে ব্রোঞ্জপদক জয় করেছে।
এই দলের তিন সদস্য তিনটি ভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। দলের নেতা ও প্রকল্প ব্যবস্থাপক সাম্মান রাহিন ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। প্রকল্পের বিদ্যুৎ ও বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। অন্যদিকে, মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী সৈয়দ সুবেহ-সাদিক ছিলেন দলের সফটওয়্যার প্রধান; তিনি মূলত নকশা ও ব্যবস্থাবিশ্লেষণের কাজগুলো সম্পন্ন করেন। এছাড়া নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী আজমাইন রুবায়েদ দায়িত্ব পালন করেছেন দলের নির্মাণ ও নকশা বিভাগের প্রধান হিসেবে।
তিন সদস্যের দায়িত্ব ভিন্ন হলেও তাদের লক্ষ্য ছিল অভিন্ন—এমন একটি গাড়ি তৈরি করা যা মানুষের কোনো সাহায্য ছাড়াই নিজে চলতে পারে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম।
‘ব্লুপ্রিন্ট’ শব্দের অর্থ হলো কোনো কিছু নির্মাণের আগে তার প্রাথমিক নকশা তৈরি করা। এই নামের মধ্যেই মিশে আছে দলটির মূল ভাবনা। তারা বাংলাদেশের রোবোটিকস ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ভবিষ্যৎকে এমন একটি নকশা হিসেবে কল্পনা করেন, যা এখনো সম্পূর্ণভাবে আঁকা হয়নি। দলনেতা সাম্মান রাহিন বলেন, ‘আমরা শুধু রোবট বানাই না, ভবিষ্যতের নকশা তৈরি করি।’
গাড়িটি কীভাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, সে বিষয়ে রাহিনরা জানান, চালকবিহীন এই গাড়িটি মূলত ক্যামেরা এবং লাইডারের (লাইট ডিটেকশন অ্যান্ড রেঞ্জিং) মাধ্যমে চারপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করে তথ্য সংগ্রহ করে। সংগৃহীত এই তথ্যগুলো পাঠানো হয় রাস্পবেরি পাই ৫-এ, যা একটি ক্ষুদ্র কম্পিউটার বোর্ড এবং গাড়ির ‘মস্তিষ্ক’ হিসেবে কাজ করে। ক্যামেরা ও লাইডার থেকে আসা তথ্য বিশ্লেষণ করে এই বোর্ডটি বুঝতে পারে সামনে কী বাধা আছে এবং গাড়িটিকে কোন দিকে বা কীভাবে এগোতে হবে। এরপর সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কাজ করে এসটিএম ৩২ নামের একটি চিপ।
গাড়িটি তৈরির প্রক্রিয়া সহজ ছিল না; টিম ব্লুপ্রিন্টের সামনে ছিল নানা চ্যালেঞ্জ। অর্থসংস্থান, সময়ের অভাব এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সীমাবদ্ধতা তো ছিলই, তার ওপর সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ভিসা প্রক্রিয়া। সাম্মান বলেন, ‘ভারতের ভিসা পাওয়ার সময়টা ছিল অনিশ্চিত। মনে হচ্ছিল, এত পরিশ্রমের পরও হয়তো আমরা প্রতিযোগিতায় পৌঁছাতেই পারব না।’
তবে পরিবার, শিক্ষক, আয়োজক এবং দলের সদস্যদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত তারা ভারতে পৌঁছাতে সক্ষম হন। কিন্তু ততক্ষণে প্রস্তুতির জন্য হাতে সময় খুব সামান্যই বাকি ছিল। প্রায় এক মাসের কাজ তাদের শেষ করতে হয় মাত্র কয়েক দিনে। অনুশীলনের জন্য তারা বেছে নেন সদস্য সুবেহ-সাদিকের বাড়ি। ঘরের মেঝেতেই প্রতিযোগিতার ট্র্যাক তৈরি করে তারা বারবার মহড়া দেন এবং এর মাধ্যমেই নিজেদের ভুলগুলো শনাক্ত করেন। হায়দরাবাদে পৌঁছানোর পরও তাদের প্রস্তুতি থামেনি। হোটেলের পাশেই অনুশীলনের ব্যবস্থা করে প্রতিযোগিতার আগের দিন সকাল পর্যন্ত তারা গাড়িতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনেন।
ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার আগেই দলটি বুঝতে পেরেছিল যে তারা ব্রোঞ্জ পদক জিতেছে। তাই চূড়ান্ত ঘোষণার মুহূর্তে তাদের বিস্ময়ের চেয়ে আক্ষেপই ছিল বেশি, কারণ ব্লুপ্রিন্টের লক্ষ্য ছিল আরও বড় কোনো সাফল্য অর্জন করা। তবে এই আক্ষেপই এখন তাদের পরবর্তী লক্ষ্য অর্জনের অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশে ওয়ার্ল্ড রোবট অলিম্পিয়াডের জাতীয় পর্যায়ের আয়োজন ও সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক (বিডিওএসএন)। এই জাতীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় যাওয়ার সুযোগ পায় টিম ব্লুপ্রিন্ট। ওয়ার্ল্ড রোবট অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাসির খান বলেন, ‘খুব অল্প সময়ে প্রস্তুতিতে টিম ব্লুপ্রিন্ট এই সাফল্য পেয়েছে। আলাদা আলাদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এসেও প্রতিযোগিতার বিষয়বস্তুকে সামনে রেখে এগিয়ে গিয়েছে। তবে এটি সত্যি যে বছরের শুরুতে যখন প্রতিযোগিতার থিম ঘোষণা করা হয়, নতুনেরা যদি সেই সময় থেকে প্রস্তুতি নেয়, তবে তারা ভবিষ্যতে আরও ভালো করতে পারবে।’
ভারতের হায়দরাবাদে অনুষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বিশ্বের ২৫টি দেশের মোট ১৪৯টি দল অংশগ্রহণ করে। বাংলাদেশ থেকে তিনটি ভিন্ন বিভাগে মোট চারটি দল অংশ নিয়েছিল। এই প্রতিযোগিতায় টিম অডিসি এক্স ‘ফিউচার ইনোভেটরস সিনিয়র’ বিভাগে সপ্তম স্থান অর্জন করে। এই দলের সদস্য ছিলেন আবিদা ওয়াদুদ ও সাদমান আল হক।