রাত নামলেই এক অজানা আতঙ্ক গ্রাস করে শরীয়তপুর পৌর এলাকাকে। দিনের ব্যস্ততা শেষ হয়ে শহরের সড়কগুলো যখন নিঝুম হয়ে আসে, ঠিক তখনই সক্রিয় হয়ে ওঠে বৈদ্যুতিক তার চোরচক্র। কখনো সরকারি দপ্তরের বিদ্যুতের খুঁটি, কখনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, আবার কখনো সাধারণ বসতবাড়ির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে কেটে নেওয়া হচ্ছে মূল্যবান বৈদ্যুতিক তার। এই চুরির ফলে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে চরম ভোগান্তির মুখে পড়ছেন সাধারণ মানুষ ও সেবাপ্রত্যাশীরা।

সাম্প্রতিক সময়ে শরীয়তপুর পৌর এলাকায় বৈদ্যুতিক তার চুরির ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয় থেকে শুরু করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত বাসাবাড়ি—কোনো স্থানই এই চোরচক্রের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। প্রায় প্রতিদিন রাতেই পৌরসভার কোনো না কোনো এলাকায় তার চুরির ঘটনা ঘটছে। এর ফলে একদিকে যেমন বিদ্যুৎ বিভাগ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, অন্যদিকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা।

ভুক্তভোগী এবং বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, একের পর এক চুরির ঘটনা ঘটলেও তা রোধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি। চুরির পর থানায় ও পুলিশ প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও পরিস্থিতির কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। ফলে চোরচক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন তারা।

গত ১৯ সেপ্টেম্বর ছুটির দিনে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে শরীয়তপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এলাকার নির্বাচন অফিসের বিদ্যুৎ খুঁটি থেকে প্রায় ৩০০ গজ তার কেটে নিয়ে যায় চোরেরা।

রোববার সকালে অফিসে এসে বিদ্যুৎ না থাকায় বিষয়টি টের পান নির্বাচন অফিসের কর্মীরা। পরবর্তীতে প্রায় দেড় লাখ টাকা ব্যয় করে নতুন বৈদ্যুতিক তার কিনে সংযোগ স্থাপন করা হয়। যদিও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়েছে, তবে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অফিসের দৈনন্দিন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়, যার ফলে সেবা নিতে আসা গ্রাহকদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

জেলার গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কার্যালয় এলাকায় এমন দুঃসাহসিক চুরির ঘটনায় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। ছুটির দিনে অফিস এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে বিপুল পরিমাণ বৈদ্যুতিক তার কেটে নেওয়া সম্ভব হলো, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

কেবল সরকারি দপ্তরই নয়, বৈদ্যুতিক তার চুরির হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না পৌর এলাকার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও। গত আগস্ট মাসে শরীয়তপুর পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের পাকার মাথা এলাকায় অবস্থিত লাকি রাইস মিলে মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে দুই দফায় বৈদ্যুতিক তার চুরি হয়। এতে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় এক লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে।

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বারবার তার চুরির ফলে উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে নতুন সংযোগ স্থাপন করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

লাকি রাইস মিলের ব্যবস্থাপক দেলোয়ার হোসেন খান বলেন, “আমাদের মিল থেকে ১০ দিনের ব্যবধানে দুই দফায় এক লাখ টাকার তার চুরি হয়েছে। প্রথমবার চুরি হওয়ার পর সিসি ক্যামেরা লাগিয়েছি। তারপরও চুরি করে নিয়ে গেছে। এখন কম দামি তার লাগিয়েছি। কিন্তু এতে অতিরিক্ত লোড হলে নিরাপত্তার ঝুঁকি রয়েছে।”

গত আগস্ট মাসেই পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সজল রায়ের বাড়ি থেকেও রাতের আঁধারে প্রায় এক লাখ ২৭ হাজার টাকা মূল্যের বৈদ্যুতিক তার চুরি হয়। বসতবাড়িতে এমন চুরির ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে।

ভবন মালিক সজল রায় বলেন, “কদিন আগে আমার নতুন ভবনের লক্ষাধিক টাকার তার চুরি হয়েছে। এরপর সিলভারের তার লাগিয়েছি। কারণ একবার চুরি হয়েছে, আবার হবে না এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। প্রশাসনের কাছে আবেদন, একজন চোর ধরা পড়েছে। তার মাধ্যমে কতজন চোর রয়েছে, সেই তথ্য নিয়ে তাদের ধরার দাবি জানাচ্ছি।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, পৌর এলাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিতভাবে বৈদ্যুতিক তার চুরি হচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, তার বাসভবন, ডিবি অফিস, সমাজসেবা কার্যালয়, বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বিসিক শিল্পনগরী এবং ব্যক্তিগত বাসাবাড়িতেও তার চুরির ঘটনা ঘটেছে।

চোরেরা সাধারণত রাতের অন্ধকারে বিদ্যুতের খুঁটি বা সংযোগস্থল থেকে তামার তৈরি তার কেটে নিয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর পরদিন সকালে বিষয়টি জানতে পারেন সংশ্লিষ্টরা। এতে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপনে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি অনেক প্রতিষ্ঠান ও পরিবারকে সাময়িক বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় কাটাতে হচ্ছে।

ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো) ও ভুক্তভোগীদের সূত্রে জানা যায়, গত দুই মাসে শরীয়তপুর পৌর এলাকায় শতাধিক বৈদ্যুতিক তার চুরির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে প্রায় ৬০টি ঘটনায় বিদ্যুৎ অফিসে লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। এতে মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় অর্ধকোটি টাকা।

ভুক্তভোগী ও বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, চুরির ঘটনায় প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা না থাকায় চোরচক্র বারবার একই ধরনের অপরাধ করার সুযোগ পাচ্ছে। চুরি হওয়া তার উদ্ধার এবং এই চক্রের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।

ওজোপাডিকোর সহকারী প্রকৌশলী ইশতিয়াক জহুর বলেন, “প্রথমবার চুরির ঘটনার পরপরই আমরা পালং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) লিখিতভাবে জানিয়েছি। এ ছাড়া প্রতিনিয়ত চুরির ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মুঠোফোনে জানানো হচ্ছে। গত দুই মাসে প্রায় ৬০টি অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে। এসব ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমরা পুলিশ সুপারকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। চিঠির পাশাপাশি আমরা প্রতিনিয়ত প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। তারপরও কেন জানি চুরির ঘটনা কমছে না, বরং প্রতিনিয়ত বাড়ছে। আমি মনে করি, প্রশাসনকে আরও কঠোর হওয়া উচিত।”

গত ১ সেপ্টেম্বর শরীয়তপুর পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের নিরালা এলাকায় বৈদ্যুতিক তার চুরির ঘটনায় সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে একজনকে শনাক্ত করেন স্থানীয়রা। পরে তাকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

তবে স্থানীয়দের দাবি, এত সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থাকার পরও ওই ঘটনার বাইরে বৈদ্যুতিক তার চুরির সঙ্গে জড়িত আর কাউকে এখন পর্যন্ত পুলিশ আটক করতে পারেনি। ফলে একের পর এক চুরির ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের দাবি, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না হলে সরকারি দপ্তর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়িতে এই চুরি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. জাকারিয়া রহমান বলেন, “বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এটা নিয়ে সব থানার পুলিশ কাজ করছে। ইতিমধ্যে আমরা তার চুরির সঙ্গে জড়িত একজনকে আটক করেছি। আশা করি, দ্রুত সময়ের মধ্যেই তার চুরির চক্রটিকে ধরা যাবে।”