ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার ধরমন্ডল ইউনিয়নে গৃহকাজের কথা বলে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীকে দীর্ঘ সময় ধরে জোরপূর্বক অনৈতিক কাজে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি ওই কিশোরীকে অপহরণ করে আটকে রেখে গরম চামচ ও খুন্তি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাঁকা দেওয়ার মতো নৃশংস নির্যাতনের ঘটনা সামনে এসেছে। তবে এই গুরুতর অপরাধের পর ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসা করার দাবি উঠেছে কিশোরীর দুই চাচার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ করা হয়েছে যে, কিশোরীটি যখন অনৈতিক কাজে রাজি হতো না, তখন তাকে নিয়মিত শারীরিক নির্যাতন ও ভয়ভীতি দেখানো হতো। সম্প্রতি ওই পরিবার থেকে পালিয়ে আসার পর তাকে বাজার থেকে তুলে নিয়ে একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়। সেখানে তাকে মারধর করার পাশাপাশি গরম চামচ ও খুন্তি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে ছ্যাঁকা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা, কিশোরীর স্বজন, ইউনিয়ন পরিষদ এবং পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ধরমন্ডল ইউনিয়নের ওই কিশোরীকে তার পরিবারের সদস্যরা দূরসম্পর্কের ফুফা মৃত জামাল মিয়ার বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। সেখানে ফুফাতো বোন তাসলিমা বেগম, তার স্বামী রাজা মিয়া, বোন খাদিজা বেগম ও ভাই লালন মিয়া তাকে গৃহকাজের পরিবর্তে দীর্ঘদিন ধরে জোরপূর্বক যৌনকাজে বাধ্য করেন। কিশোরীর অভিযোগ, এই অনৈতিক কাজে রাজি না হলে তাকে বিভিন্ন সময়ে মারধর ও ভয়ভীতি দেখানো হতো।
প্রায় ১০ থেকে ১২ দিন আগে ওই কিশোরী নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে সেখান থেকে পালিয়ে নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন। তবে গত বুধবার সন্ধ্যায় পান-সুপারি কেনার জন্য বাড়ি থেকে বাজারের দিকে যাওয়ার সময় তাকে জোর করে তুলে পুনরায় ওই পরিবারের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি কক্ষে আটকে রেখে মুখ বেঁধে নির্যাতন করা হয় বলে কিশোরীটি অভিযোগ করেছেন।
কিশোরীর অভিযোগ, একপর্যায়ে তাসলিমা, খাদিজা ও লালন তাকে গরম চামচ ও খুন্তি দিয়ে দুই হাতের কনুইয়ের ওপর এবং পিঠে ছ্যাঁকা দেন। এ ছাড়া ধারালো কোনো বস্তু দিয়ে তার ডান পায়েও আঘাত করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, কিশোরীর কান্নার শব্দ শুনে তারা তাকে উদ্ধার করেন।
এদিকে গত শুক্রবার বিকেলে বিষয়টি মীমাংসার জন্য কিশোরীর দুই চাচা অভিযুক্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে পুরো বিষয়টি মীমাংসা করা হয় এবং অভিযুক্ত পরিবার থেকে ওই টাকা দেওয়া হয়। তবে চিকিৎসার জন্য কিশোরীকে মাত্র ৬ হাজার টাকা দেওয়া হলেও বাকি টাকা তার দুই চাচা নিজেদের কাছে রেখে দিয়েছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি কিশোরীর বাড়িতে গেলে সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। দীর্ঘদিনের নির্যাতন, জোরপূর্বক যৌনকাজে বাধ্য করা এবং সম্প্রতি গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়ার কথা উল্লেখ করে কিশোরী ও তার পরিবার অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুবক্কর সিদ্দিক বলেন, “বাসাবাড়িতে কাজ দেওয়ার কথা বলে কিশোরীকে নিয়ে নির্যাতন ও যৌনকাজে বাধ্য করা এবং পরে বাজার থেকে তুলে নিয়ে আটকে রেখে মারধর ও গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়ার কথা কিশোরী তাদের জানিয়েছেন।”
তিনি আরও জানান, তার ভাষ্য অনুযায়ী, স্বজনেরা বিষয়টি ৫০ হাজার টাকায় মীমাংসা করে কিশোরীকে মাত্র ৬ হাজার টাকা দিয়েছেন। এছাড়া তিনি অভিযোগ করেন, শনিবার সকাল থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত স্থানীয় লোকজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের কার্যালয় এলাকায় উপস্থিত থাকলেও কিশোরী ও তার পরিবারকে সেখানে আসতে দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি অভিযুক্তদেরও এলাকায় পাওয়া যাচ্ছে না বলে তিনি জানান।
এই পুরো ঘটনায় কিশোরীর এক চাচা বলেন, “বিষয়টি আত্মীয়স্বজনের মধ্যে ঘটেছে। আমরা নিজেরা বসে বিষয়টি শেষ করে দিয়েছি।”
নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহীনুল ইসলাম বলেন, “ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। তবে ভুক্তভোগী কিশোরীর পরিবার কোনো অভিযোগ করতে চাচ্ছে না।”