দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উৎকর্ষ সাধনে এবং নতুন নতুন উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ আইসিটি অ্যান্ড ইনোভেশন নেটওয়ার্ক (বিন) আয়োজন করেছে ‘বাংলাদেশ আইসিটি অ্যান্ড ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬’। ‘উদ্ভাবনকে স্বীকৃতি, রূপান্তরকে অনুপ্রেরণা’ প্রতিপাদ্যের আলোকে আজ শনিবার ঢাকার ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি মিলনায়তনে এই জমকালো অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়। সারা দেশ থেকে আসা মোট ৩৫৫টি প্রকল্পের মধ্য থেকে কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের পর ৪৪টি তথ্যপ্রযুক্তি উদ্ভাবনকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আয়োজক কমিটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবারের প্রতিযোগিতায় ৯টি উদ্ভাবন চ্যাম্পিয়ন, ১০টি উইনার এবং ২৫টি উদ্ভাবন মেরিট পুরস্কার লাভ করেছে। বিজয়ীদের হাতে ক্রেস্ট, সনদপত্র এবং আকর্ষণীয় উপহার ভাউচার তুলে দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগ দেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি। এছাড়া সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসাইন এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. ইমদাদ উল বারী।
অনুষ্ঠানে তার বক্তব্যে প্রধান অতিথি ফকির মাহবুব আনাম বলেন, ‘ছেলেমেয়েরা আইডিয়া নিয়ে আসছে, কিন্তু আমরা তা বাস্তবায়ন করতে পারছি না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় সাত লাখ শিক্ষার্থী স্নাতক সম্পন্ন করছে। এই বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। আমাদের তরুণদের সৃজনশীলতা, দক্ষতা ও উদ্ভাবনী চিন্তাকে কাজে লাগাতে হবে। আমরা চাই, বাংলাদেশের তরুণেরা বিশ্বের সেরা উদ্ভাবকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করুক এবং নিজেদের সক্ষমতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরুক। তরুণ প্রজন্মই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।’
বিশেষ অতিথি জোনায়েদ সাকি তার বক্তব্যে উদ্ভাবনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘ইনোভেশন একটা সাধনার মতো। যাঁরা আজ পুরস্কার পাননি, তাঁরা সাধনা চালিয়ে গেলে এর থেকেও ভালো কিছু করবেন। অর্থনৈতিক উন্নতি করতে বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি ও উদ্ভাবন একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। এই বাজেটেই আমরা গবেষণায় বরাদ্দ বাড়াতে চাই। এই উদ্ভাবনগুলোকে কীভাবে আরও সত্যিকারের সহযোগিতায় আনা যায়—এ জন্য কোনো সন্দেহ নাই যে সরকার, ব্যবসায়ী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যুক্ত হতে হবে এক জায়গায়। আমরা আমাদের তরুণদের ওপর আশাবাদী যখন তরুণেরা রাজনীতি, দেশের সমস্যায় সক্রিয় হন, যখন তরুণেরা দেশের সমস্যার সমাধানের পথ নিয়ে ভাবেন, তখন সেই দেশের ভবিষ্যৎ আছে।’
বিনের চেয়ারম্যান সৈয়দ আলমাস কবীর উদ্ভাবন সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমাদের উদ্ভাবনগুলোকে কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া যায়, তার নীতিমালা করতে হবে। বাংলাদেশে গবেষণা হয় না তহবিলের অভাবে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করতে হবে তহবিল দেওয়ার জন্য। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় উদ্ভাবন ও গবেষণাকে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই হবে না, আমাদের নিজেদের প্রযুক্তি ও জ্ঞান তৈরি করতে হবে।’
এবারের প্রতিযোগিতায় দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিগত ও দলীয় পর্যায়ে মোট ৩৫৫টি প্রকল্প জমা পড়ে। প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ের পর ১১৮টি প্রকল্প চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য নির্বাচিত হয়। মূল্যায়ন প্রক্রিয়াটি দুই ধাপে সম্পন্ন হয়; ১৭ সেপ্টেম্বর আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে (এআইইউবি) প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিগত বা দলীয় প্রকল্পগুলোর মূল্যায়ন করা হয় এবং ১৯ সেপ্টেম্বর ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষার্থী শ্রেণির প্রকল্পগুলোর মূল্যায়ন অনুষ্ঠিত হয়।
প্রকল্পগুলো মূল্যায়নের জন্য সরকার, ব্যাংক ও করপোরেট খাতের নির্বাহী, শিক্ষাবিদ, চেম্বার প্রতিনিধি, স্টার্টআপ-বিশেষজ্ঞ এবং প্রযুক্তি সাংবাদিকদের সমন্বয়ে গঠিত ৪০ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ বিচারক প্যানেল কাজ করেন। ডিজিটাল জাজিং পোর্টালের মাধ্যমে উদ্ভাবনের স্বকীয়তা, জন-উপযোগিতা, বাণিজ্যিক সম্ভাবনা এবং প্রযুক্তির মান—এই চারটি প্রধান মানদণ্ডের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়।
এবারের প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে মোট নয়টি উদ্ভাবন। প্রতিষ্ঠান শ্রেণিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে সক্রিয় টেকনোলজিস লিমিটেডের ‘সক্রিয় ডিএমএস’, টেটন প্রাইভেট লিমিটেডের ‘মাই ইসিজিএআই’ এবং গ্রামীণ হেলথটেক লিমিটেডের ‘দ্য সুখী ওয়ে: কানেক্টেড কেয়ার থ্রু ইন্টিগ্রেটেড ডিজিটাল সার্ভিসেস’। শিক্ষার্থী শ্রেণিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘এজেন্টআইএএম’, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের ‘ক্রনিক’, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সিঙ্ক ভি-১: ব্রেইল এমবসার’, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আরবর’ এবং বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজের ‘ব্রেইলব্রিজ’। এছাড়া ব্যক্তিগত বা দলীয় শ্রেণিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ‘বিন্দো’।
চ্যাম্পিয়ন ছাড়াও ১০টি উদ্ভাবন উইনার নির্বাচিত হয়েছে, যার মধ্যে প্রতিষ্ঠান শ্রেণিতে ৩টি, ব্যক্তিগত বা দলীয় শ্রেণিতে ১টি এবং শিক্ষার্থী শ্রেণিতে ৬টি উদ্ভাবন রয়েছে। উল্লেখ্য, চ্যাম্পিয়ন ও উইনার নির্বাচিত উদ্ভাবনগুলো এশিয়া প্যাসিফিক আইসিটি অ্যালায়েন্স (অ্যাপিকটা) অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬-এ বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য মনোনয়ন পাবে। পাশাপাশি ২৫টি উদ্ভাবন মেরিট পুরস্কার পেয়েছে, যার মধ্যে প্রতিষ্ঠান শ্রেণিতে ৫টি, ব্যক্তিগত বা দলীয় শ্রেণিতে ৩টি এবং শিক্ষার্থী শ্রেণিতে ১৭টি উদ্ভাবন অন্তর্ভুক্ত।
পুরস্কৃত উদ্ভাবনগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সিঙ্ক ভি-১: ব্রেইল এমবসার’ বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই প্রকল্পের দলনেতা সৌরভ তরফদার বলেন, ‘আমাদের প্রকল্পটা হলো ব্রেইল প্রিন্টারের দাম সাত লাখ টাকার মতো। এত বেশি দামের কারণে বাংলাদেশে যে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী আছে, তাদের পড়ালেখায় সমস্যা হচ্ছে। সেই কথা চিন্তা করেই আমরা কম খরচে মাত্র ২৮ হাজার টাকার মধ্যে একটি ব্রেইল প্রিন্টার বানিয়েছি। আমরা যদি তহবিল পাই, তাহলে এই পণ্য অনেক বেশি আকারে বানাতে পারব।’
বাংলাদেশ আইসিটি অ্যান্ড ইনোভেশন নেটওয়ার্ক (বিন) এই পুরো আয়োজনটি পরিচালনা করে। অনুষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ছিল ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি (ইবিএল), অনলাইন মার্কেটপ্লেস কার্টআপ, এআইইউবি, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, গ্রামীণ হেলথটেক লিমিটেড, সুপার স্টার গ্রুপ ও ওয়ালটন। নলেজ পার্টনার হিসেবে যুক্ত ছিল এআইইউবি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি এবং স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হিসেবে ছিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়।