প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি এবং কাঙ্ক্ষিত সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কারিকুলাম, শিক্ষক, মনিটরিং, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি—এই পাঁচটি প্রধান বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করার কথা বলেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তাঁর মতে, প্রাথমিক শিক্ষার প্রতিটি ক্ষেত্র একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। তাই একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে উন্নয়ন ঘটিয়ে অন্য ক্ষেত্রগুলোকে অবহেলা করলে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাওয়া সম্ভব হবে না। মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতেই এই সমন্বিত সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর শেরাটন হোটেলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে ‘ফ্রম দ্য ফিল্ড টু রিফর্ম: অ্যাডভান্সিং প্রাইমারি এডুকেশন ইন বাংলাদেশ (মাঠপর্যায় থেকে সংস্কার: বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রযাত্রা)’ শীর্ষক একটি জাতীয় সংলাপ ও অভিজ্ঞতা বিনিময় কর্মশালার আয়োজন করা হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এসব কথা বলেন।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রাথমিক শিক্ষার ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ও দিকনির্দেশনা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রদান করেছেন এবং সরকার সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি শিশুর জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়ন, নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের উপযোগী দক্ষতা অর্জনের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে ববি হাজ্জাজ জানান, গত কয়েক মাসে প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত কর্মকর্তা, মনিটরিং কর্মকর্তা এবং বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে তাঁর ৬০ ঘণ্টার বেশি আলোচনা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় তিন হাজারের বেশি অংশীজনের মতামত ও অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৭০০-এর বেশি মনিটরিং কর্মকর্তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলা হয়েছে এবং দেড় হাজারের বেশি প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা ও মতামত নেওয়া হয়েছে। এসব আলোচনা ও মতামতের মাধ্যমেই প্রাথমিক শিক্ষার বর্তমান সমস্যা, অগ্রাধিকার এবং সম্ভাব্য সমাধানের বিষয়ে একটি বাস্তবভিত্তিক ধারণা পাওয়া গেছে বলে তিনি জানান।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ২০২৮ সালে নতুন কারিকুলাম চালুর লক্ষ্য নিয়ে বর্তমানে শিখনফলভিত্তিক ও শিশুবান্ধব শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ চলছে। এক্ষেত্রে বাংলা, গণিত ও ইংরেজিতে দক্ষতা বৃদ্ধি, খেলনাভিত্তিক শিক্ষা, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং ব্যবহারিক শিখন কার্যক্রমের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শিখন-সময়ের বৈষম্য কমিয়ে আনা এবং সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় মানদণ্ড নির্ধারণের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

শিক্ষকদের বিষয়ে কথা বলে প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, “মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষক নিয়োগ, প্রাক্‌-চাকরি প্রশিক্ষণ, পদায়ন, পেশাগত উন্নয়ন ও মূল্যায়নকে সমন্বিত করে শিক্ষক নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে।”

অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয়ে তিনি বলেন, “প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো শুধু ভবননির্ভর হলে চলবে না; শ্রেণিকক্ষ, আসবাবপত্র, শৌচাগার ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা শিশুদের উপযোগী করতে হবে।”

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ করতে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষা, বেতন-ভাতা বৃদ্ধি ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তিনি আরও জানান, শিক্ষা খাতে পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে এবং প্রথম অর্থবছরেই এই খাতে ২ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ পুনরায় গুরুত্ব দিয়ে বলেন যে, শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে যাতে তারা শ্রেণিকক্ষে কার্যকরভাবে পাঠদান করতে পারেন। আগামী দুই বছরে নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নের প্রস্তুতির পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা, শিক্ষকস্বল্পতা দূর করা এবং তাদের জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া শিক্ষার্থীদের দলভিত্তিক আলোচনা ও পারস্পরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে শেখার সুযোগ বাড়ানো এবং পাঠ্যবিষয়ের ব্যাপ্তির চেয়ে শিখনের গভীরতা ও গুণগত মানের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

কর্মশালায় স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য মো. মোক্তার আলী, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য রেজা কিবরিয়া ও বীথিকা বিনতে হোসাইন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী গিয়াস উদ্দিন এবং গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধুরী। এই জাতীয় সংলাপে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, দেশি-বিদেশি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।