রাতে পাশে থাকা সঙ্গীর জোরে নাক ডাকার শব্দে বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া কেবল বিরক্তির কারণ নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাবে সকালে ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি, খিটখিটে মেজাজ এবং কাজে অনীহা দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়।
সাধারণত ঘুমের সময় গলার ওপরের অংশের শ্বাসনালির নরম টিস্যু শিথিল হয়ে যায়। বাতাস চলাচলের সময় এসব টিস্যুতে কম্পন তৈরি হলে নাক ডাকার শব্দ হয়। ব্রিটিশ স্নোরিং অ্যান্ড স্লিপ অ্যাপনিয়া অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের প্রায় ৪০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নাক ডাকেন, যার মধ্যে নারীদের তুলনায় পুরুষদের এই প্রবণতা বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের স্লিপ ফাউন্ডেশনের জরিপেও দেখা গেছে, নাক ডাকার কারণে সঙ্গীর ঘুমে ব্যাপক প্রভাব পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরবচ্ছিন্ন ঘুম না হলে মস্তিষ্ক প্রয়োজনীয় বিশ্রাম পায় না, যা স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ঘুমের গভীর পর্যায়টি শারীরিক পুনরুদ্ধারের জন্য অত্যন্ত জরুরি, যা খণ্ডিত হলে পরদিনের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয়।
ঘুমের এই ঘাটতি মেজাজের ওপরও প্রভাব ফেলে। ২৯ বছর বয়সী মেগ ওয়ারেন তার অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, "সাবেক সঙ্গীর নাক ডাকার কারণে রাতে তার বারবার ঘুম ভেঙে যেত। সকালে ঘুম থেকে উঠে তার ঝিমঝিম ও দিশেহারা লাগত। কখনও কখনও তার মনে হতো, যেন আগের রাতে অতিরিক্ত মদ্যপান করেছেন।"
দীর্ঘদিন এই সমস্যা চললে সম্পর্কের ওপরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে। ডেন্টাল স্লিপ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ দন্তচিকিৎসক ক্লেয়ার সাইমনের মতে, ঘুমের ব্যাঘাত খিটখিটে মেজাজ ও ঝগড়া বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে অনেকে আলাদা ঘরে ঘুমানোর সিদ্ধান্ত নেন। এতে দম্পতিদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা কমে যেতে পারে। ৫২ বছর বয়সী সাংবাদিক আনা-লুইজ ডিয়ার্ডেন জানান, পর্যাপ্ত ঘুম না হলে তার পরদিন বেশি খাওয়ার প্রবণতা ও খিটখিটে মেজাজ দেখা দেয়। তিনি নাক ডাকার শব্দ কমাতে ইয়ারপ্লাগ ব্যবহার করেন এবং কখনও কখনও আলাদা ঘরে ঘুমান।
তবে নাক ডাকা সব সময় সাধারণ বিষয় নয়; এটি 'স্লিপ অ্যাপনিয়া'র লক্ষণ হতে পারে। স্লিপ অ্যাপনিয়া এমন একটি অবস্থা যেখানে ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হওয়া, হাঁসফাঁস করা, সকালে মাথাব্যথা এবং দিনের বেলা অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব।
চিকিৎসকরা জানান, স্লিপ অ্যাপনিয়া ধরা পড়লে তীব্রতা অনুযায়ী সিপিএপি (CPAP) যন্ত্র বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। তবে সাধারণ নাক ডাকার ক্ষেত্রে ওজন কমানো, ধূমপান ও অ্যালকোহল বর্জন, কাত হয়ে শোয়া এবং অ্যালার্জির চিকিৎসা কার্যকর হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে বিশেষ মাউথগার্ড ব্যবহার করা হয়।
পরিশেষে, সঙ্গীর নাক ডাকার সমস্যাকে কেবল রাতের বিরক্তি হিসেবে না দেখে এর মূল কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। যদি নিয়মিতভাবে ঘুম ব্যাহত হয় বা শ্বাসকষ্টের লক্ষণ দেখা দেয়, তবে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।