সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫ পরীক্ষায় লিখিত ও মৌখিক ধাপ পেরিয়ে চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও প্রায় এক হাজার চাকরিপ্রার্থী নিয়োগপত্র পাননি। পুলিশ ও এনএসআইয়ের ভেরিফিকেশনে বাদ পড়ার পর এসব প্রার্থীর অভিযোগ, সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ ছাড়াই তাদের নিয়োগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সারাদেশে সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের নিয়োগপত্র বিতরণের পর এই বিষয়টি সামনে আসে। এরপর থেকে বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীরা বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করছেন এবং ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।

আক্রান্ত প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন নীলফামারী জেলার স্বপন কুমার রায়। তিনি দিনাজপুরের হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও (রোল নম্বর ৪৩১৭৪৫২) ভেরিফিকেশনের পর তার নামে নিয়োগপত্র ইস্যু হয়নি। স্বপনের পরিবারের দাবি, তাদের কেউ কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন; এমনকি তার ভাই তপন কুমার রায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য।

একই অভিযোগ করেছেন চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণের তামান্না আক্তার। তিনি উপজেলার মেধাতালিকায় প্রথম এবং পুরো জেলায় ১১তম হয়েও আট মাস অপেক্ষার পর নিয়োগপত্র পাননি। তামান্নার দাবি, তাকে ‘পলিটিক্যাল ট্যাগ’ দিয়ে বাদ দেওয়া হয়েছে, যদিও তিনি বা তার পরিবারের কেউ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।

বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীদের অভিযোগ, অনেকের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা না থাকা সত্ত্বেও রহস্যজনকভাবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কথা বলে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এমনকি উপজেলা পর্যায়ে মেধাতালিকায় শীর্ষে থাকা প্রার্থীরাও নিয়োগপত্র পাননি। সরকারিভাবে কতজন প্রার্থী বাদ পড়েছেন তার সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করা না হলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে এই সংখ্যা প্রায় এক হাজার বা তার বেশি।

প্রার্থীদের দাবি, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর বৈষম্যহীন নিয়োগের প্রত্যাশা থাকলেও তারা নতুন করে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। তারা ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা এবং অভিযোগহীন প্রার্থীদের নিয়োগের দাবি জানিয়ে গণমাধ্যমে এক বিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন।

এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। শুক্রবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, "লিখিত পরীক্ষাসহ নিয়োগের সব ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করার পরও অন্তত এক হাজার তরুণ-তরুণীকে দীর্ঘ আট মাস ভেরিফিকেশনের নামে অনিশ্চয়তা ও হয়রানির মধ্যে রাখা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তাদের নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি।"

তিনি আরও বলেন, "সুনির্দিষ্ট ও আইনসম্মত অভিযোগ না থাকা প্রার্থীদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।" একই সঙ্গে তিনি বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া এবং ভেরিফিকেশনের মানদণ্ড জনসমক্ষে স্পষ্ট করার দাবি জানান।

ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনাকে চরম বৈষম্যমূলক ও অন্যায্য বলে অভিহিত করেছেন। শুক্রবার এক ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেন, "প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ তরুণদের ভেরিফিকেশনের নামে বাদ দেওয়া চরম বৈষম্যমূলক ও অন্যায্য।"

সাদিক কায়েম বাদ পড়া প্রার্থীদের বিষয়ে পুনঃসিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার দাবি জানান। অন্যদিকে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও বৈষম্যের অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।

চাকরিপ্রার্থীদের এই অভিযোগের বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা মোবাইল বা হোয়াটসঅ্যাপ কলে সাড়া দেননি।