সাধারণত উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে খাবারে লবণের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। তবে লবণের ঘাটতি বা শরীরে সোডিয়ামের মাত্রা অতিরিক্ত কমে গেলেও তৈরি হতে পারে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি। শরীরের তরলের ভারসাম্য রক্ষা, স্নায়ুর কার্যকারিতা এবং পেশির স্বাভাবিক চলাচলের জন্য সোডিয়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যাওয়ার অবস্থাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় 'হাইপোনাট্রেমিয়া' বলা হয়। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, কেবল লবণ কম খাওয়ার কারণেই রক্তে সোডিয়াম কমে যায় না। অতিরিক্ত পানি পান, নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের প্রভাব, কিডনি বা হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা এবং হরমোনজনিত জটিলতার কারণেও এই সমস্যা হতে পারে।
সোডিয়ামের ঘাটতি হলে মূলত তিনটি প্রধান লক্ষণ দেখা দিতে পারে:
১. মাথা ঘোরা ও দুর্বলতা: রক্তে সোডিয়াম কমে গেলে শরীরের তরলের ভারসাম্য নষ্ট হয়, যার ফলে মাথা ঘোরা, দুর্বলতা এবং অস্বাভাবিক ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে। তবে পানিশূন্যতা, রক্তশূন্যতা বা রক্তচাপের সমস্যার কারণেও এমনটি হতে পারে, তাই কেবল এই লক্ষণ দেখে সোডিয়ামের ঘাটতি বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
২. পেশিতে টান বা দুর্বলতা: সোডিয়াম সরাসরি স্নায়ু ও পেশির কাজের সঙ্গে যুক্ত। এর ঘাটতি হলে পেশিতে দুর্বলতা বা ক্র্যাম্প হতে পারে। তবে অতিরিক্ত ঘাম বা পানিশূন্যতার কারণেও পেশিতে টান ধরতে পারে।
৩. বিভ্রান্তি ও আচরণগত পরিবর্তন: সোডিয়ামের মাত্রা খুব বেশি কমে গেলে মস্তিষ্কের কার্যক্রমে প্রভাব পড়ে। এর ফলে মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, বিভ্রান্তি বা অস্বাভাবিক আচরণ দেখা দিতে পারে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে খিঁচুনি বা জ্ঞান হারানোর মতো জরুরি অবস্থা তৈরি হতে পারে, যার জন্য দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন।
হাইপোনাট্রেমিয়ার পেছনে কেবল লবণ কম খাওয়া নয়, বরং অতিরিক্ত পানি পানের ফলে রক্তে সোডিয়াম পাতলা হয়ে যাওয়া বা ডাইইউরেটিক জাতীয় ওষুধের প্রভাব থাকতে পারে। আবার সোডিয়ামের আধিক্যও সমান ক্ষতিকর। অতিরিক্ত সোডিয়াম রক্তচাপ বাড়িয়ে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে চিপস, নোনতা বিস্কুট, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, সস এবং প্রক্রিয়াজাত মাংসের মাধ্যমে অজান্তেই শরীরে প্রচুর সোডিয়াম প্রবেশ করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দিনে ২০০০ মিলিগ্রামের কম সোডিয়াম গ্রহণ করা উচিত, যা প্রায় ৫ গ্রাম বা এক চা-চামচের চেয়ে সামান্য কম লবণের সমান। এই পরিমাণের মধ্যে রান্নার লবণ এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার থেকে আসা সোডিয়াম—উভয়ই অন্তর্ভুক্ত।
শরীরে সোডিয়ামের মাত্রা কমেছে কি না, তা কেবল লক্ষণ দেখে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। রক্ত পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে প্রস্রাব পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসক সঠিক কারণ নির্ণয় করেন। তাই বারবার মাথা ঘোরা, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা বিভ্রান্তির মতো লক্ষণ দেখা দিলে নিজে থেকে লবণ না বাড়িয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোই নিরাপদ।