ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পরিসংখ্যান বিভাগের ছাত্রী ছিলেন রাইসা শাম্মা। এখন তিনি পড়ছেন ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোতে। আইইএলটিএস পরীক্ষায় ৯-এর মধ্যে ৯ পেয়েছেন তিনি। নিজের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ তুলে ধরেছেন এই শিক্ষার্থী।

রাইসার মতে, আইইএলটিএসে ৯-এ ৯ পাওয়া তাঁর জন্য শুধু ভালো ফল নয়, বরং ছোটবেলা থেকে গড়ে ওঠা কিছু অভ্যাসের ফল। পরীক্ষার আগে খুব বেশি সময় নিয়ে প্রস্তুতি নিতে পারেননি তিনি। তবে তাঁর বিশ্বাস, কোনো দক্ষতা এক দিনে তৈরি হয় না। ইংরেজি ভাষার সঙ্গে দীর্ঘদিনের যোগাযোগ, নিয়মিত পড়ার অভ্যাস, ইংরেজি কনটেন্ট দেখা এবং শেখার আগ্রহ তাঁকে এই জায়গায় এনে দিয়েছে।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পরিসংখ্যান বিভাগে পড়েছেন। বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর মাস্টার অব ম্যানেজমেন্ট অ্যানালিটিকস বিভাগে পড়ছেন। উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত জীবনের প্রয়োজনে আইইএলটিএস পরীক্ষা দিয়েছিলেন তিনি।

তিনি মনে করেন, আইইএলটিএসের জন্য শুধু শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়। পরীক্ষার কৌশল জানা জরুরি, তবে তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন ভাষার সঙ্গে নিয়মিত সম্পর্ক তৈরি করা। লিসেনিং, রিডিং, রাইটিং ও স্পিকিং—প্রতিটি অংশে ভালো করার জন্য আলাদা কৌশল আছে। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে সেগুলোই সংক্ষেপে বলেছেন তিনি।

লিসেনিং দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে তাঁর সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ইংরেজি শোনার অভ্যাস। ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন ইংরেজি অনুষ্ঠান, খবর, সিনেমা ও অন্যান্য কনটেন্ট দেখতেন তিনি। শুরুতে সবকিছু বুঝতে পারতেন না; বিশেষ করে বিভিন্ন দেশের উচ্চারণ বুঝতে কঠিন লাগত। ধীরে ধীরে অভ্যাস গড়ে তোলেন। প্রথমে সাবটাইটেল দিয়ে দেখতেন, পরে সাবটাইটেল ছাড়া বোঝার চেষ্টা করতেন। এভাবে কান ইংরেজি ভাষার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যায়। তাঁর মতে, লিসেনিং শেখার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়মিত শোনা। যাঁরা ইংরেজি শেখা শুরু করছেন, তাঁরা সহজ কনটেন্ট দিয়ে শুরু করতে পারেন। অ্যানিমেটেড সিনেমা, সহজ গল্প, পডকাস্ট বা সংবাদ শোনা যেতে পারে। শুরুতে সব শব্দ বুঝতে না পারলেও সমস্যা নেই; নিয়মিত শুনলে ধীরে ধীরে শব্দ, উচ্চারণ ও বাক্যের ধরন বোঝা সহজ হয়। আইইএলটিএসের লিসেনিং অংশে শুধু ইংরেজি বোঝার ক্ষমতা থাকলেই হবে না, পরীক্ষার ধরন সম্পর্কেও ধারণা থাকতে হবে। অনেক সময় পরীক্ষায় এমন তথ্য থাকে, যা মনোযোগ নষ্ট করতে পারে; যেমন নাম, ঠিকানা বা ফোন নম্বরের ক্ষেত্রে ভুল হওয়ার সুযোগ থাকে। তাই মক টেস্ট দেওয়া এবং কী ধরনের প্রশ্ন আসে তা আগে থেকে বোঝা জরুরি।

ইংরেজি রিডিং বা পড়ার দক্ষতা তৈরিতে তাঁর সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে বই পড়ার অভ্যাস। ছোটবেলা থেকে বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষার বই পড়তেন তিনি। ধীরে ধীরে সহজ বই থেকে কঠিন বইয়ের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাঁর মতে, ভোকাবুলারি বা শব্দভান্ডার বাড়ানোর সবচেয়ে ভালো উপায় শব্দকে বাস্তব ব্যবহারে দেখা। শুধু অর্থ মুখস্থ করলে তা বেশি দিন মনে থাকে না; কিন্তু বাক্যে বা গল্পে শব্দটি কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, তা বুঝলে সহজে মনে থাকে। অনেকে আইইএলটিএসের আগে অনেক শব্দ মুখস্থ করার চেষ্টা করেন। তবে তাঁর অভিজ্ঞতা, দীর্ঘদিনের রিডিংয়ের অভ্যাস থাকলে ভোকাবুলারি স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। রিডিং পরীক্ষায় তাঁর কৌশল ছিল প্রথমে পুরো প্যাসেজ পড়ে মূল বিষয় বোঝা, এরপর গুরুত্বপূর্ণ শব্দ, নাম, সংখ্যা বা বিশেষ তথ্য চিহ্নিত করা। বারবার পুরো প্যাসেজ পড়লে সময় নষ্ট হয়; বরং প্রথমে ধারণা তৈরি করে পরে প্রশ্ন অনুযায়ী উত্তর খুঁজলে সময় বাঁচে। তিনি মনে করেন, রিডিং শুধু আইইএলটিএসের জন্য প্রয়োজনীয় নয়; এটি চিন্তাভাবনা, বিশ্লেষণক্ষমতা এবং নিজের ভাবনা প্রকাশের দক্ষতাও বাড়ায়।

আইইএলটিএসের রাইটিং অংশ অনেকের কাছেই কঠিন মনে হয়। কারণ এখানে শুধু ইংরেজি জানা যথেষ্ট নয়; নিজের চিন্তাকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে প্রকাশ করতে হয়। রাইসার ক্ষেত্রে ছোটবেলা থেকে লেখার অভ্যাস অনেক সাহায্য করেছে। কোনো কিছু পড়ে সারাংশ লেখা, নতুন শব্দ লিখে রাখা এবং নিজের চিন্তা লিখে রাখার অভ্যাস ছিল তাঁর। এমন ছোট ছোট চর্চাই পরে বড় কাজে এসেছে। রাইটিং ভালো করতে প্রথমে গ্রামারের ভিত্তি ভালো করতে হবে। বিশেষ করে সেনটেন্স স্ট্রাকচার, টেন্স এবং সাবজেক্ট ভার্ব অ্যাগ্রিমেন্টের মতো বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে জানতে হবে। অনেকে মনে করেন, কঠিন শব্দ ব্যবহার করলেই ভালো লেখা হয়; আসলে বিষয়টি এমন নয়। পরিষ্কার, যুক্তিসংগত ও সুন্দরভাবে সাজানো লেখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আইইএলটিএস রাইটিংয়ে কমপ্লেক্স সেনটেন্স তৈরি করার দক্ষতা দরকার। কয়েকটি ছোট বাক্য আলাদা আলাদা না লিখে কীভাবে একই ভাবকে সুন্দরভাবে একসঙ্গে প্রকাশ করা যায়, তা শিখতে হবে। রাইটিং টাস্কে শুধু তথ্য লিখলেই হবে না, তথ্যের অর্থও বুঝিয়ে বলতে হবে। কোনো গ্রাফ বা চার্ট দেওয়া হলে শুধু সংখ্যা উল্লেখ না করে সেখানে কী পরিবর্তন হয়েছে, কেন হতে পারে, তাও বিশ্লেষণ করতে হবে।

স্পিকিংয়ের ক্ষেত্রে তাঁর সবচেয়ে বড় পরামর্শ, ভয় না পেয়ে কথা বলা শুরু করা। অনেকেই ইংরেজি বুঝতে ও লিখতে পারেন, কিন্তু কথা বলার সময় আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন। ছোটবেলা থেকেই ইংরেজিতে কথা বলার চেষ্টা করেছেন রাইসা। আশপাশে যাঁরা ভালো ইংরেজি বলতেন, তাঁদের কথা শুনতেন; তাঁরা কীভাবে বাক্য তৈরি করছেন, কীভাবে উচ্চারণ করছেন—এসব লক্ষ করতেন। তাঁর মতে, স্পিকিং উন্নত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় নিয়মিত কথোপকথন। বন্ধুদের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলা, নিজের চিন্তা ইংরেজিতে প্রকাশের চেষ্টা—এসব অভ্যাস খুব কাজে দেয়। আইইএলটিএস স্পিকিংয়ে মুখস্থ উত্তর দিয়ে ভালো করা কঠিন, কারণ এটি আসলে একটি স্বাভাবিক কথোপকথন। পরীক্ষার্থীকে নিজের অভিজ্ঞতা, পছন্দ, মতামত ও চিন্তা স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ করতে হয়। পরীক্ষায় সাধারণ কিছু বিষয় বারবার আসে—কোথায় থাকেন, কী পছন্দ করেন, কী ধরনের বই পড়েন বা কী ধরনের কনটেন্ট দেখেন। এগুলোর উত্তর মুখস্থ না করে নিজের জীবন থেকে উদাহরণ দিয়ে বলার অভ্যাস করতে হবে। তাঁর বিশ্বাস, একজন ভালো বক্তা হওয়ার জন্য শুধু ইংরেজি শেখা যথেষ্ট নয়; একজন ভালো শ্রোতা হতে হবে, অনেক কিছু জানতে হবে এবং নিজের চিন্তা পরিষ্কারভাবে প্রকাশের অভ্যাস করতে হবে। শেষ পর্যন্ত আইইএলটিএস তাঁকে শিখিয়েছে, কোনো দক্ষতা রাতারাতি তৈরি হয় না; ছোট ছোট অভ্যাস, নিয়মিত চর্চা এবং শেখার আগ্রহই একসময় বড় সাফল্য এনে দেয়।