মেয়াদ শেষ হওয়ার চার দিন আগে বর্তমান ডাকসু ‘ডিইউ টিচার্স ইভাল্যুশন’ নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করেছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিজ বিভাগের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করছেন। এই উদ্যোগের ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষকদের মূল্যায়ন ফলাফল ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাইটটিতে রিভিউ ফলাফল প্রকাশ বন্ধ রাখা হলেও, এখন পর্যন্ত ৭ হাজার ৫০ জন শিক্ষার্থী সাইনআপ করেছেন এবং ২ হাজার ৪৫ জন শিক্ষকের জন্য ১১ হাজার ৩৪৭টি রিভিউ জমা পড়েছে।
বাংলাদেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদানের অভিজ্ঞতার আলোকে এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের দ্বারা শিক্ষক মূল্যায়ন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, তবে এর আয়োজন করার কথা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। একাডেমিক কাউন্সিলের নির্ধারিত রূপরেখা অনুযায়ী অনুষদ বা বিভাগ এটি বাস্তবায়ন করবে এবং ফলাফল কেবল শিক্ষকদের কাছেই যাবে, শিক্ষার্থীদের কাছে নয়। এর মাধ্যমে শিক্ষকেরা তাঁদের পাঠদান পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা পাবেন এবং প্রয়োজনে তা পুনর্বিন্যাস করবেন। সন্তোষজনক ফলাফল না এলে বিভাগীয় প্রধান বা ডিন তাঁদের সাথে আলোচনা করে উন্নতির পথ খুঁজবেন।
স্পষ্টভাবেই বলা যায়, ডাকসুর এই উদ্যোগ তাঁদের এখতিয়ারবহির্ভূত। ডাকসুর মূল কাজ হলো শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা, সুযোগ-সুবিধার তত্ত্বাবধান, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ এবং নেতৃত্ব তৈরি করা। শিক্ষকদের বিষয়ে ভূমিকা রাখা তাঁদের কাজের পরিধির বাইরে। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মূল্যায়নব্যবস্থার অনুপস্থিতি এবং ডাকসুর সামাজিক গুরুত্বের কারণে এই আলোচনাটি এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে না।
অন্যদিকে, বর্তমান শিক্ষার্থী-ইউনিয়নগুলো একটি নির্দিষ্ট ছাত্রসংগঠনের প্রভাবাধীন। জুলাই পরবর্তী পরিস্থিতিতে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা একের পর এক এখতিয়ারবহির্ভূত কাজ করে গেছেন। যেমন—রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয়জন ডিনকে পদত্যাগে বাধ্য করা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের হেনস্তা করা এবং রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক ভবন ভস্মীভূত করতে উসকানি দেওয়া। ফলে এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
তবে এই ঘটনার ফলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়নের অভাব নিয়ে সমালোচনা জোরালো হয়েছে এবং কর্তৃপক্ষ চাপের মুখে পড়েছে। লেখক জানান, তিনি চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘকাল পড়িয়েছেন, তবে সেখানে শিক্ষার্থীদের দ্বারা মূল্যায়নের মুখোমুখি হননি। অন্যদিকে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সময় তিনি শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের অভিজ্ঞতা পেয়েছেন, যা তাঁর পাঠদান পদ্ধতি বুঝতে সাহায্য করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বার্ড কলেজে পড়ানোর অভিজ্ঞতায় লেখক লক্ষ্য করেন, সেখানে পাঠদান লেকচারনির্ভর নয়, বরং ক্লাস-অ্যাকটিভিটি, গ্রুপ আলোচনা এবং সৃজনশীল প্রশ্নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের চ্যালেঞ্জ করার প্রক্রিয়া বিদ্যমান। প্রথম সেমিস্টারে লেখকের মূল্যায়নের ফল খুব একটা ভালো আসেনি। তখন তাঁর সুপারভাইজার অধ্যাপক মূল্যায়নপত্র নিয়ে আলোচনা করেন এবং স্লাইড ও পাঠদান পদ্ধতিতে পরিবর্তনের পরামর্শ দেন। ফলে পরবর্তী সেমিস্টারে তাঁর মূল্যায়নে লক্ষণীয় উন্নতি ঘটে।
শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের এই পদ্ধতি শিক্ষকের পাঠদানে প্রকৃত উন্নতি ঘটাতে পারে; এখানে অসম্মানিত বোধ করার কিছু নেই। লক্ষ্য হওয়া উচিত মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক পুরোনো নোট-বইনির্ভর পাঠদান পদ্ধতি আঁকড়ে ধরে আছেন এবং নিজেদের হালনাগাদ করতে অনাগ্রহী। এছাড়া ক্লাস না নেওয়া, ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব, শিক্ষার্থীদের সাথে দুর্ব্যবহার বা অবিদ্যায়তনিক কাজে ব্যস্ত থাকার মতো ঘটনাগুলো মূল্যায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে সামনে আসবে। যেহেতু অনেক কর্তৃপক্ষ নিজেই এসব কাজে জড়িত, তাই মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা কার্যকর হয়নি।
ডাকসুর এই উদ্যোগটি অনেকটা ‘রেট মাই প্রফেসর’ পোর্টালের মতো, যা ১৯৯৯ সালে জন সোয়াপচেনস্কি চালু করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্যের শিক্ষার্থীরা সেখানে শিক্ষকদের রেট করেন। তবে সেসব দেশে নিজস্ব মূল্যায়ন ব্যবস্থা থাকায় এই পোর্টালটিকে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কিন্তু আমাদের দেশে নিজস্ব ব্যবস্থা না থাকায় ডাকসুর উদ্যোগটি বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত অবিলম্বে একটি আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা।
● ফাহমিদুল হক যুক্তরাষ্ট্রের বার্ড কলেজের শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক। মতামত লেখকের নিজস্ব।